সাধারণত জাতীয় বাজেট ঘোষণার পরদিনই দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট ও দাম বাড়ানোর হিড়িক দেখা যায়। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণার পরদিনের চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। নতুন বাজেটের কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি রাজধানীর সবজির বাজারে। উল্টো গ্রীষ্মকালীন সবজির পর্যাপ্ত এবং অবাধ সরবরাহের কারণে বাজারে দাম উল্টো কমতির দিকে, যা সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ক্রেতাদের মাঝে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর শেওড়াপাড়া, তালতলাসহ বেশ কয়েকটি বড় কাঁচাবাজার ঘুরে বাজার পরিস্থিতির এই ব্যতিক্রমী চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ সবজির দাম শুধু স্থিতিশীলই নয়, বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। বিক্রেতারা বলছেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সবজিবাহী ট্রাক নিয়মিত আসায় বাজারে কোনো ঘাটতি নেই।
প্রধান সবজি ও শাকসবজির বর্তমান দরদাম— ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি : পটোল, ঢেঁড়স, ঝিঙে, চিচিঙ্গা ও ধুন্দল। অন্যান্য সবজি : বেগুন প্রকারভেদে ৫০ থেকে ৮০ টাকা, করলা ৪০ থেকে ৬০ টাকা, কচুর লতি ৬০ থেকে ৮০ টাকা এবং পেঁপে কেজিতে ২০ টাকা কমে এখন ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শাকের বাজার : বাজারে লাল শাক প্রতি আঁটি ১৫ টাকা, লাউ শাক ৪০ টাকা, পুঁই শাক ৩০ টাকা এবং কলমি ও ডাঁটা শাক দুই আঁটি ২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মরিচ ও পেঁয়াজ : কাঁচা মরিচের দাম কেজিতে ২০ টাকা কমে ৬০ থেকে ৮০ টাকায় নেমেছে। দেশি পেঁয়াজ কেজিতে ৫ টাকা কমে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা এবং আলু ২৫ থেকে ৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
তালতলা বাজারের প্রবীণ সবজি বিক্রেতা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিবছর বাজেটের পরের দিন কাস্টমাররা ভয়ে বাজারে আসে না যে দাম বেড়ে গেল কি না। কিন্তু এবার আমাদের আড়তেই মালের অভাব নেই। সরবরাহ ভালো থাকলে বাজেটে সবজির দাম বাড়ে না।’ শেওড়াপাড়া বাজারে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকুরিজীবী জনাব শাওন বলেন, ‘বাজেট ঘোষণার পর ভেবেছিলাম সবকিছুর দাম আবার আকাশছোঁয়া হবে, পকেট ফাঁকা হয়ে যাবে। বাজারে এসে দেখলাম সবজির দাম বেশ কম। পটোল বা ঢেঁড়স ৩০-৪০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে, যা এই সময়ে অনেক বড় স্বস্তি।’
তবে এই ক্রেতা মাঠপর্যায়ের আরেকটি বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, সবজির দাম কমলেও চাল, ডাল আর ভোজ্যতেলের বাজার এখনো বেশ চড়া, যা সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের বড় খরচের খাত। ৩. মাছ ও মাংসের বাজার পরিস্থিতি : সবজি বাজারে স্বস্তি থাকলেও মাংস ও মাছের বাজার কিছুটা মিশ্র প্রবণতা দেখাচ্ছে। বাজেটের পরদিন ব্রয়লার মুরগি স্থিতিশীল থাকলেও সোনালি মুরগির দাম কিছুটা বেড়েছে।
ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৫৫ টাকা এবং দেশি মুরগি ৭৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে সোনালি কক মুরগি কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে ৩৩০ টাকা এবং সোনালি হাইব্রিড ৩০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
ডিম : বাজারে প্রতি ডজন মুরগির লাল ডিম ১৩০ টাকা, হাঁসের ডিম এক ডজন ২০০ টাকা এবং দেশি মুরগির ডিমের হালি ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাছের বাজার : মাছের বাজারে আকারভেদে দামের বেশ তারতম্য দেখা গেছে। ইলিশ মাছের দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরেই রয়েছে। ৩০০ গ্রাম ওজনের ১ কেজি ইলিশ ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকা এবং ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ২০০০ থেকে ২২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া চাষের রুই মাছের দাম কিছুটা বেড়ে আকারভেদে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং পাঙাশ ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের পরদিন সবজির বাজার স্থিতিশীল থাকা প্রমাণ করে যে, পর্যাপ্ত দেশীয় উৎপাদন ও সরবরাহ চেইন ঠিক থাকলে বাজারের সিন্ডিকেট বা কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির চেষ্টা সফল হয় না। সবজি ও কাঁচামরিচের এই দরপতন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের খরচ কিছুটা হলেও কমাবে। তবে সরকারের বিপণন ও নজরদারি সংস্থাগুলোর উচিত হবে শুধু সবজি বাজারেই নয়, বরং চাল, ডাল, ভোজ্যতেল ও মাছ-মাংসের মতো অন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতের ওপরও কঠোর মনিটরিং বজায় রাখা; যাতে বাজেটের অজুহাতে কোনো অসাধু চক্র সাধারণ মানুষের পকেট কাটতে না পারে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন