জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশ এবার পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি এক বিশাল সবুজ অর্থনৈতিক বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছে। সরকারের ঘোষিত দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে উৎপন্ন ‘কার্বন ক্রেডিট’ আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা) আয় করতে পারে।
সরকারের সম্প্রতি একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিবেদনে এই ঈর্ষণীয় সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই মেগা উদ্যোগটি সফল হলে তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে যেমন বড় অবদান রাখবে, ঠিক তেমনি বিশ্বমঞ্চে পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের নেতৃত্বকে আরও সুসংহত করবে।
চলতি জুন মাসের ১৩ তারিখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী পাঁচ বছর মেয়াদি (২০২৬-৩১) দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের এই ঐতিহাসিক সবুজ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এই উদ্যোগের প্রাথমিক ও প্রধান লক্ষ্য হলো দেশের পরিবেশগত সুরক্ষা জোরদার করা, বনায়ন বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বিভিন্ন বিরূপ প্রভাব ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করা।
তবে সরকারের সদ্য প্রকাশিত ‘জলবায়ু অর্থায়ন বাজেট প্রতিবেদন’-এ এই কর্মসূচির একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং লাভজনক অর্থনৈতিক দিক উন্মোচিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বৃহৎ পরিসরের বনায়ন কর্মসূচির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বিপুল পরিমাণ কার্বন ক্রেডিট উৎপাদনের সম্ভাবনা। কার্বন ক্রেডিট কী : একটি কার্বন ক্রেডিট হলো মূলত এক মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বা তার সমতুল্য ক্ষতিকারক গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডল থেকে হ্রাস, অপসারণ বা প্রতিরোধের একটি আন্তর্জাতিকভাবে যাচাইকৃত প্রত্যয়িত একক।
সাধারণত বনায়ন (গাছপালা লাগানো), নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প (সৌর বা বায়ু বিদ্যুৎ), কারখানার জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং মিথেন গ্যাস নিয়ন্ত্রণের মতো পরিবেশবান্ধব কার্যক্রমের মাধ্যমে এই ক্রেডিট তৈরি হয়। প্যারিস জলবায়ু চুক্তির ‘আর্টিকেল ৬’ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছা মানদণ্ডের অধীনে এই বাজার পরিচালিত হয়। বিশ্বের বড় বড় শিল্পোন্নত দেশ বা বহুজাতিক কোম্পানিগুলো (যারা কারখানায় বেশি কার্বন নির্গমন করে) তাদের দূষণের ক্ষতিপূরণ বা ভারসাম্য করতে বাংলাদেশের মতো সবুজ দেশগুলোর কাছ থেকে এই যাচাইকৃত ‘কার্বন ক্রেডিট’ কিনে নেয়।
এটি আন্তর্জাতিকভাবে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ‘স্বেচ্ছা কার্বন বাজার’ হিসেবে পরিচিত। সরকারি প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংকের একটি সাম্প্রতিক হিসাব উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, যদি বাংলাদেশ এই ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কঠোরভাবে বজায় রেখে সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে শুধু এই বনায়ন খাত থেকেই বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কার্বন ক্রেডিট বিক্রি করা সম্ভব। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম কম মাথাপিছু গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশ হওয়ায় এবং এই বিশাল বনায়ন প্রকল্পের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণের সুযোগ থাকায়, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের উৎপাদিত ক্রেডিটের চাহিদা ও মূল্য থাকবে অনেক বেশি।
১ বিলিয়ন ডলারের প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি এই ২৫ কোটি গাছের মাধ্যমে দেশের প্রকৃতি ও অর্থনীতি পরোক্ষভাবে আরও বড় ধরনের সুফল লাভ করবে। প্রতিবেদন অনুযায়ী এর প্রধান পরিবেশগত দিকগুলো হলো— তাপমাত্রা হ্রাস ও শীতলীকরণ : জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে দেশে যে তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দিচ্ছে, এই বিশাল বনায়ন তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনবে। বৃষ্টিপাতের ধরন উন্নয়ন : সুষম বনায়ন দেশের চিরচেনা ঋতুচক্র এবং বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ও সময়োপযোগী রূপ ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে। মাটির গুণগত মান বৃদ্ধি: গাছের শিকড় মাটির ক্ষয় রোধ করবে, উপকূলীয় অঞ্চলে জলোচ্ছ্বাস প্রতিরোধ করবে এবং মাটির উর্বরতা বাড়াবে।
বাস্তুতন্ত্রের সহনশীলতা : দেশের বিপন্ন বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্যের জন্য এটি এক নিরাপদ অভয়ারণ্য গড়ে তুলবে, যা সামগ্রিক সবুজ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে তরান্বিত করবে। বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রতিবেদনটিতে একটি রূঢ় সত্যও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখনো আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে পূর্ণাঙ্গ ও পেশাদারভাবে অংশ নিতে পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।
এই বিলিয়ন ডলারের বাজার ধরতে হলে দেশের প্রধান ৩টি বড় ঘাটতি বা চ্যালেঞ্জ দ্রুত দূর করতে হবে— ১. প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব : প্যারিস চুক্তির ‘আর্টিকেল ৬’ ব্যবস্থার জটিল আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন ও কার্বন বাণিজ্যের কৌশল বিষয়ে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কারিগরি জ্ঞান এখনো বেশ সীমিত। ২. আইনগত কাঠামোর দুর্বলতা : দেশে কার্বন ক্রেডিট ইস্যু, তার মালিকানা নির্ধারণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি বা নিয়ন্ত্রক নীতিমালা নেই। ৩. এমআরভি সক্ষমতার ঘাটতি : কার্বন বাণিজ্যের মূল শর্ত হলো শক্তিশালী ‘পরিমাপ, প্রতিবেদন ও যাচাইকরণ’ ব্যবস্থা। কোন গাছ কতটা কার্বন শোষণ করছে, তার আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেট বা সনদায়নের ক্ষেত্রে আমাদের সরকারি ও বেসরকারি খাতের সক্ষমতা এখনো অপর্যাপ্ত।
প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিটি কেবল গাছ লাগানোর কোনো চ্যারিটি বা গতানুগতিক সামাজিক উদ্যোগ নয়; এটি মূলত বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি অত্যন্ত লাভজনক ‘সবুজ সোনার খনি’। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি বছরে ১ বিলিয়ন ডলার আয়ের এই সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। আন্তর্জাতিক কার্বন বাজার ধরতে হলে সরকারকে আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি পরিহার করে অবিলম্বে কার্বন বাণিজ্যের জন্য একটি আধুনিক আইনি নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক মানের এমআরভি টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন