তীব্র সুপেয় পানির সংকটে যখন পিরোজপুর পৌর এলাকার লক্ষাধিক মানুষ হাবুডুবু খাচ্ছেন, ঠিক তখনই এক চরম প্রশাসনিক উদাসীনতার চিত্র সামনে এসেছে। পিরোজপুর পৌরসভায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত শহরের নামাজপুর এলাকার আধুনিক ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টটি (পানি শোধনাগার) দীর্ঘ ৬ বছর ধরে সম্পূর্ণ তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার সুযোগে প্ল্যান্টের মূল্যবান বৈদ্যুতিক মালামাল, তার ও বিভিন্ন দামি যন্ত্রপাতি চুরি করে নিয়ে গেছে চোর চক্র।
চুরির এই ন্যক্কারজনক ঘটনার পর পৌর কর্তৃপক্ষ চোর ধরার বা সুরক্ষার ব্যবস্থা না করে উল্টো প্ল্যান্টের মূল গেটটি লোহার রড দিয়ে ঝালাই করে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। পৌর এলাকায় শতভাগ বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক বন্ধুভাবাপন্ন দেশ জাপানের অর্থায়ন ও কারিগরি সহযোগিতায় নামাজপুরে এই আধুনিক পানি শোধনাগার প্ল্যান্টটি নির্মাণ করা হয়। বৈশ্বিক মানদণ্ড মেনে ২০২০ সালে এর নির্মাণ কাজ সফলভাবে শেষ হওয়ার পর একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা পিরোজপুর পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করেছিল নির্মাণকারী সংস্থা। চুক্তি ও কার্যপ্রণালি অনুযায়ী, পিরোজপুর পৌরসভা কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্ল্যান্টটির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে স্থানীয় জনগণের মাঝে সুলভ মূল্যে নিরাপদ পানি সরবরাহ করার কথা ছিল।
তবে হস্তান্তরের পর দীর্ঘ ৬ বছর পেরিয়ে গেলেও রহস্যজনক কারণে এটি একবারের জন্যও চালু করা হয়নি। ফলে আড়াই কোটি টাকার এই প্রকল্প এখন স্রেফ জং ধরা লোহার কঙ্কালে পরিণত হতে চলেছে। এক নজরে নামাজপুর ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট— প্রকল্প ব্যয় : প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। সহযোগিতাকারী দেশ : জাপান। নির্মাণ কাজ শেষ : ২০২০ খ্রিষ্টাব্দ। অচল থাকার মেয়াদ : ৬ বছর (২০২০-২৬)। সেবা বঞ্চিত জনসংখ্যা : পিরোজপুর পৌরসভার লক্ষাধিক মানুষ। ৩০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই পিরোজপুর পৌরসভায় বর্তমানে লক্ষাধিক জনগণের বসবাস। প্রতিবছর বিশেষ করে গ্রীষ্ম মৌসুমে এই বিশাল অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করে।
এমন পরিস্থিতিতেও সরকারি এই মহৎ উদ্যোগটি আলোর মুখ না দেখায় জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পিরোজপুর পৌর এলাকায় বর্তমানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠা ৫-৬টি বাণিজ্যিক পানি শোধনাগার বা জারের পানির ব্যবসা রয়েছে। সরকারি এই প্ল্যান্ট টি চালু হলে ওইসব বেসরকারি ব্যবসায়ী ও পানি সিন্ডিকেটের কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাবে। তাই তারা চায় না পৌরসভার এই সরকারি প্ল্যান্টটি সচল হোক। দীর্ঘদিন ধরে প্ল্যান্টটি বন্ধ রাখা এবং রহস্যজনকভাবে ভেতরের মূল্যবান মালামাল চুরির পেছনে এই প্রভাবশালী পানি ব্যবসায়ী চক্রের কোনো যোগসাজশ বা গভীর হাত থাকতে পারে বলে স্থানীয়রা তীব্র সন্দেহ প্রকাশ করছেন।
নামাজপুর এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা বশির আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যখন এই বিশাল প্রকল্পের কাজ শুরু হইছিল, আমরা ভাবছিলাম চালু হইলে আমাগো এলাকাসহ পুরো পৌরসভার পানির কষ্ট দূর হইবো। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ৬ বছর ধইরা এই আড়াই কোটি টাকার প্ল্যান্ট তালাবদ্ধ পইড়া রইছে। পাহারা না থাকায় চোরেরা ভেতরের সব দামি পার্টস চুরি কইরা নিয়া গেল, আর পৌরসভা এখন গেট ঝালাই কইরা দিয়া দায়িত্ব শেষ করছে! আমরা দ্রুত এই চুরির তদন্ত এবং প্ল্যান্টটি চালুর দাবি জানাই।’ তীব্র সংকটের মাঝেও কেন দীর্ঘ ৬ বছরে এই আধুনিক প্ল্যান্টটি চালু করা গেল না, তার ভিন্ন এক ব্যাখ্যা দিয়েছেন পিরোজপুর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী ধ্রুব লাল দত্ত বণিক।
পৌরসভা কর্তৃপক্ষের দাবি, প্ল্যান্টটি সচল ও বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে একাধিকবার ইজারা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু কয়েক দফা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করার পরও কোনো উপযুক্ত ইজারাদার বা আউটসোর্সিং ঠিকাদার না পাওয়ায় সেটি চালু করা সম্ভব হয়নি।
এছাড়া পিরোজপুর পৌরসভায় বর্তমানে তীব্র জনবল ও টেকনিক্যাল অপারেটর সংকট থাকায়, পৌরসভা কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে এই আধুনিক প্ল্যান্টটি পরিচালনা বা রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারছে না। একটি আধুনিক ও সম্পূর্ণ প্রস্তুত ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্রেফ ইজারাদার না পাওয়া বা জনবল সংকটের দোহাই দিয়ে ৬ বছর ধরে বন্ধ রাখা রাষ্ট্রীয় সম্পদের চরম অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। যেখানে কোটি কোটি টাকা খরচ করে নতুন নতুন প্রকল্প নেয়া হচ্ছে, সেখানে বিদেশি অনুদানে পাওয়া আড়াই কোটি টাকার একটি সচল প্রকল্পকে ব্যর্থ হতে দেয়া চরম প্রশাসনিক ব্যর্থতা বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন