অপরাধী চক্রের অভয়ারণ্য রাজধানী

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জুলাই ১, ২০২৬, ১২:৪৪ এএম
অপরাধী চক্রের অভয়ারণ্য রাজধানী

রাজধানী ঢাকা এখন অপরাধী চক্রের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। পুলিশের সামপ্রতিক তথ্য এবং অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ২১ মাসে ঢাকা মহানগরীতে গড়ে প্রতিদিন একটি করে খুনের ঘটনা ঘটেছে। ভাড়াটে খুনি থেকে শুরু করে ডাকাত ও ছিনতাইকারী সব মিলিয়ে অন্তত ১১৭টি পেশাদার অপরাধী দল নগরীর অলিগলিতে তাদের দাপট চালিয়ে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই ভয়াবহ অবনতি নগরবাসীর মনে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত গত ২১ মাসে ঢাকা মহানগরে মোট ৫৯৭টি খুনের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এই একই সময়ে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মামলার সংখ্যা ৭৭৩টি। এছাড়া পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১৪২ বার, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল ও সক্ষমতা নিয়ে বড় প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।

রাজধানীর নিউমার্কেটের নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন হত্যা কিংবা রামপুরায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিন খান পলাশ হত্যা এসব আলোচিত হত্যাকাণ্ডের দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও মূল পরিকল্পনাকারী ও অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে না পারা পুলিশের ব্যর্থতাকে আরও প্রকট করে তুলেছে।

গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, রাজধানীতে সক্রিয় ১১৭টি অপরাধী দলের সদস্যদের প্রধান কাজ হলো ভাড়াটে খুন, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও মাদক কারবার। এসব অপরাধী দলের অনেকের পেছনেই রয়েছে প্রভাবশালী মহলের হাত। পুলিশ অপরাধীদের নাম ও ঠিকানা সম্পর্কে অবগত থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই অজ্ঞাত কারণে তারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অবশ্য দাবি করেছেন যে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে এবং গত পাঁচ মাসে প্রায় ১৮ হাজার অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, এত গ্রেপ্তারের পরও কেন অপরাধের লাগাম টানা সম্ভব হচ্ছে না।

সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, অপরাধ পরিস্থিতির এই ভয়াবহতার পেছনে স্থায়ী ও কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখন গণমাধ্যমে আলোচিত ঘটনার অপেক্ষায় থাকে এবং ছোটখাটো অপরাধকে গুরুত্ব দেয় না, তখন অপরাধীদের সাহস বেড়ে যায়। অপরাধ দমনে বাহিনীর অভ্যন্তরে দায়বদ্ধতার অভাব এবং অপরাধীদের সঙ্গে বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যের যোগসাজশ থাকাটা এখন ওপেন সিক্রেট।’ তিনি আরও বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশ বাহিনী নতুন করে গুছিয়ে ওঠার চেষ্টা করলেও বাহিনীটির পুনর্গঠন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। কেবল উপসর্গ নিয়ে কাজ করলে নগরীর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; অপরাধের উৎসগুলো ধ্বংস করা জরুরি।

রাজধানীর প্রতিটি মোড়ে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকা সত্ত্বেও অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে। ভুক্তভোগীদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে মামলা করার পর পুলিশের পক্ষ থেকে অপরাধী শনাক্তে গড়িমসি করা হয়। দিনের পর দিন একই চক্র এলাকায় অপরাধ চালিয়ে গেলেও স্থানীয় প্রশাসন কার্যত নীরব থাকে। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে ঢাকা অচিরেই বসবাসের অযোগ্য ও বিপজ্জনক নগরী হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরাও।

রাজধানীর এই চরম নিরাপত্তাহীনতা কেবল একটি আইনি সমস্যা নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ। প্রতিদিন একজন মানুষ খুন হওয়া কিংবা ডজন ডজন ছিনতাইয়ের ঘটনা ঢাকা মহানগরীর সামগ্রিক সুশাসনের ব্যর্থতাকে নির্দেশ করে। অপরাধীদের রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী আশ্রয়ের শিকল ভাঙতে না পারলে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সম্পূর্ণ স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক ও পেশাদার করে গড়ে তুলতে না পারলে নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব বলে অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এখনই কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যাতে কোনো অপরাধীই আইনের ঊর্ধ্বে না থাকে। ঢাকা শহরকে অপরাধমুক্ত করতে প্রশাসনিক সংস্কার ও কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছাই এখন একমাত্র পথ।