আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হতে যাচ্ছে চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা। সারা দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ১২ লাখ ৬৭ হাজার ৪৮৬ জন শিক্ষার্থী এই পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে প্রস্তুত। গত বছরের তুলনায় এ বছর শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির পাশাপাশি কেন্দ্রগুলোতে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডগুলো নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
এ বছর সারা দেশের ২ হাজার ৬৯৭টি পরীক্ষা কেন্দ্রে শিক্ষার্থীরা তাদের মেধার স্বাক্ষর রাখবে। বোর্ডভিত্তিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা দেয়া হলো— ঢাকা বোর্ডে শিক্ষার্থী ৩,০০,৩৯৩ জন; রাজশাহী বোর্ডে শিক্ষার্থী ১,৪০,৮৩০ জন; যশোর বোর্ডে শিক্ষার্থী ১,১৭,২১০ জন; দিনাজপুর বোর্ডে শিক্ষার্থী ১,১৩,৪৭৯ জন; চট্টগ্রাম বোর্ডে শিক্ষার্থী ৯৯,৬৮৮ জন; কুমিল্লা বোর্ডে শিক্ষার্থী ৯৪,৮০২ জন; ময়মনসিংহ বোর্ডে শিক্ষার্থী ৭৩,০৩৭ জন; সিলেট বোর্ডে শিক্ষার্থী ৭১,৭১১ জন; বরিশাল বোর্ডে শিক্ষার্থী ৫৮,৬৬৪ জন; মাদ্রাসা বোর্ডে শিক্ষার্থী ৯২,৯০৫ জন এবং কারিগরি বোর্ডে শিক্ষার্থী ১,০৭,৯৬৪ জন। পরীক্ষা প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে। শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে এবং শৃঙ্খলা রক্ষায় পরীক্ষা শুরুর ৩০ মিনিট আগে অবশ্যই নিজ নিজ কেন্দ্রে এবং কক্ষের ভেতর আসন গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় দেরিতে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য তথ্য রেজিস্টার করার সুযোগ থাকলেও নিয়মিত উপস্থিতির ক্ষেত্রে কোনো শিথিলতা প্রদর্শন করা হবে না। এইচএসসি পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবার কঠোর সব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- ১. সিসিটিভি নজরদারি: প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও সচল রাখা বাধ্যতামূলক। কেন্দ্র কর্তৃপক্ষকে ক্যামেরার যাবতীয় টেকনিক্যাল তথ্য বোর্ডে জমা দিতে হয়েছে।
২. প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা: পরীক্ষা শুরুর তিনদিন আগেই প্রশ্নপত্র ট্রেজারি বা থানা লকারে কঠোর নিরাপত্তায় সংরক্ষণ করা হয়েছে। পরীক্ষার দিন নির্ধারিত সেট কোড পাওয়ার পরই প্রশ্নপত্রের প্যাকেট খোলার নিয়ম রয়েছে। ৩. ডিজিটাল ডিভাইস নিষিদ্ধ: ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছাড়া অন্য কোনো কর্মকর্তার মোবাইল ফোন বা ইলেকট্রনিক ডিভাইস কেন্দ্রে প্রবেশ নিষেধ। পরীক্ষার্থীরা সাধারণ ঘড়ি ছাড়া অন্য কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস সঙ্গে রাখতে পারবে না।
যে কোনো ধরনের অসংগতি বা জরুরি তথ্য আদান-প্রদানের জন্য ঢাকা শিক্ষা বোর্ড বিশেষ কন্ট্রোল রুম খুলেছে। পরীক্ষা সংক্রান্ত যে কোনো সহায়তার জন্য সংশ্লিষ্টরা এই নম্বরে যোগাযোগ করতে পারবেন— টেলিফোন: ০২-২২৩৩৬৯৮১৫, মোবাইল: ০১৫৫০৪১১২০৩, ০১৭১৪৯৯৪০৭৩, ০১৭৫৬১০৩১৫২; ই-মেইল: পড়হঃৎড়ষষবৎ্তফযধশধবফঁপধঃরড়হনড়ধৎফ.মড়া.নফ.
এইচএসসি পরীক্ষা একজন শিক্ষার্থীর জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। ১২ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ও প্রত্যাশা এই পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে। শিক্ষা বোর্ড ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি এবং শিক্ষক ও অভিভাবকদের সচেতন সহযোগিতায় এবার একটি সুষ্ঠু, নকলমুক্ত ও আনন্দঘন পরিবেশে পরীক্ষা সম্পন্ন হবে এমনটাই প্রত্যাশা দেশবাসীর।
এইচএসসি পরীক্ষা ঘিরে ডিএমপির বিশেষ নিরাপত্তা নির্দেশনা : সারা দেশে একযোগে শুরু হতে যাওয়া ২০২৬ সালের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ এবং নকলমুক্ত পরিবেশে সম্পন্ন করতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। এ লক্ষ্যে পরীক্ষা কেন্দ্রের আশপাশে অননুমোদিত ব্যক্তিদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদের স্বাক্ষরিত এ গণবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আগামী ২ জুলাই থেকে রাজধানীর বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্রে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হবে। পরীক্ষা চলাকালীন প্রতিদিন সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের ২০০ গজের মধ্যে পরীক্ষার্থী এবং পরীক্ষা পরিচালনার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারো অবস্থান বা প্রবেশের অনুমতি থাকবে না।
ডিএমপি জানিয়েছে, পরীক্ষার সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা বজায় রাখা, অসাধু চক্রের তৎপরতা প্রতিরোধ এবং পরীক্ষার্থীদের জন্য নির্বিঘ্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। গণবিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৬-এর ২৮ ও ২৯ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। পরীক্ষা চলাকালীন সময়জুড়ে এ নির্দেশনা কার্যকর থাকবে এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা বাস্তবায়নে দায়িত্ব পালন করবে।
ডিএমপির তথ্যমতে, রাজধানীর বিভিন্ন কেন্দ্রে ২০২৬ সালের এইচএসসি, এইচএসসি (ভোকেশনাল), এইচএসসি (বিএম/বিএমটি), ডিপ্লোমা ইন কমার্স এবং আলিম পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিটি কেন্দ্রকে নিরাপত্তার আওতায় এনে পরীক্ষার সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, পরীক্ষা চলাকালে কেন্দ্রের আশপাশে অপ্রয়োজনীয় ভিড়, যানজট কিংবা যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সাদা পোশাকের সদস্যও দায়িত্ব পালন করবেন, যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অপ্রীতিকর ঘটনা দ্রুত প্রতিরোধ করা যায়।
এ ছাড়া পরীক্ষা কেন্দ্রের প্রবেশপথ, প্রশ্নপত্র বহনের রুট এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিশেষ নজরদারির ব্যবস্থা রাখা হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও পরীক্ষা পরিচালনায় সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করবেন। ডিএমপি অভিভাবক ও সাধারণ নাগরিকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে, পরীক্ষা চলাকালে কেন্দ্রের সামনে অযথা ভিড় না করতে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে।
একই সঙ্গে পরীক্ষার্থীদের যথাসময়ে কেন্দ্রে উপস্থিত হওয়ার জন্যও পরামর্শ দেয়া হয়েছে, যাতে শেষ মুহূর্তের যানজট বা অন্য কোনো কারণে তারা সমস্যায় না পড়েন। বিশেষ করে রাজধানীর ব্যস্ত সড়কসংলগ্ন কেন্দ্রগুলোতে পরীক্ষা শুরুর আগে ও শেষে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ তৈরি হতে পারে। এ কারণে ট্রাফিক পুলিশ প্রয়োজন অনুযায়ী যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করবে এবং পরীক্ষার্থীদের যাতায়াতে অগ্রাধিকার দেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতি বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা দেশের অন্যতম বৃহৎ পাবলিক পরীক্ষা। এতে লাখো শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাই পরীক্ষা কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রশ্নফাঁসের গুজব প্রতিরোধ, নকলমুক্ত পরিবেশ বজায় রাখা এবং পরীক্ষার্থীদের মানসিক স্বস্তি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্টরা আরও মনে করেন, পরীক্ষা চলাকালে কেন্দ্রের বাইরে অপ্রয়োজনীয় মানুষের উপস্থিতি অনেক সময় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। পাশাপাশি কিছু অসাধু চক্র প্রযুক্তির অপব্যবহার করে পরীক্ষায় অনিয়মের চেষ্টা করতে পারে। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখেই কেন্দ্রের চারপাশে নিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ডিএমপি জানিয়েছে, পরীক্ষা কেন্দ্রের নির্ধারিত নিরাপত্তা এলাকায় কোনো ব্যক্তি আইন অমান্য করে প্রবেশের চেষ্টা করলে বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে। তাই সবাইকে সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এদিকে শিক্ষা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, কেন্দ্রসচিব, শিক্ষক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পরীক্ষার প্রতিটি ধাপ যেন স্বচ্ছ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়, সে লক্ষ্যেই বিভিন্ন পর্যায়ে প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।
ডিএমপি আশা প্রকাশ করেছে, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতায় এবারও রাজধানীতে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
আগামী ২ জুলাই থেকে পরীক্ষা কার্যক্রম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিএমপির জারি করা এই বিশেষ নির্দেশনাও কার্যকর হবে। পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত রাজধানীর প্রতিটি কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি ও আইনগত ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন