মেট্রোরেল পৌঁছাচ্ছে কমলাপুরে

মো. নেয়ামত উল্যাহ প্রকাশিত: জুলাই ১২, ২০২৬, ০১:১১ এএম
মেট্রোরেল পৌঁছাচ্ছে কমলাপুরে

রাজধানীর উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত বর্তমানে চালু থাকা মেট্রোরেল (এমআরটি লাইন-৬) এখন তার শেষ গন্তব্যের খুব কাছাকাছি। মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ের পথে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাসেই এই বর্ধিত অংশে পরীক্ষামূলকভাবে যাত্রীবিহীন মেট্রোরেল চলাচলের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। আর সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চললে আগামী বছরের এপ্রিল মাসেই যাত্রী নিয়ে সরাসরি ট্রেন কমলাপুর স্টেশনে পৌঁছাবে। ঢাকার ব্যস্ততম জনজীবনে সময় ও অর্থের সাশ্রয় নিশ্চিত করতে মেট্রোরেল এক আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল সেবা চালু থাকলেও কমলাপুর রেলস্টেশনের সাথে সরাসরি সংযোগ না থাকায় যাত্রীদের মতিঝিল থেকে বাড়তি সময় ও রিকশা ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। কমলাপুর পর্যন্ত এই সংযোগ স্থাপিত হলে উত্তরা থেকে আসা যাত্রীরা সরাসরি দেশের প্রধান রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছাতে পারবেন, যা যাতায়াত ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল ও আরামদায়ক করবে।

প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত দৈনিক প্রায় পাঁচ লাখ যাত্রী পরিবহন করার সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে চার লাখের বেশি যাত্রী নিয়মিত সেবা গ্রহণ করছেন। তবে মেট্রোরেল কমলাপুর পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গরূপে সম্প্রসারিত হলে দৈনিক যাত্রী পরিবহন ক্ষমতা ৬ লাখ ৭৭ হাজারে উন্নীত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এটি শুধুমাত্র যানজট নিরসন নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির চাকা সচল রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বর্তমানে মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশের ভৌত অবকাঠামো নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। স্টেশন বিল্ডিংয়ের ফিনিশিং কাজ এবং রেললাইন ও ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল কাজের অগ্রগতিও সন্তোষজনক। ডিএমটিসিএল জানিয়েছে, মতিঝিল পর্যন্ত অংশে দিনের বেলায় নিয়মিত যাত্রী পরিবহন চালু থাকায়, কমলাপুর অংশের পরীক্ষামূলক চলাচল মূলত রাত ১২টার পর পরিচালনা করা হবে। এই চ্যালেঞ্জিং কাজগুলো সম্পন্ন করার জন্য ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।

জানুয়ারিতে পরীক্ষামূলক যাত্রা এবং এপ্রিল মাসে যাত্রী পরিবহন— এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে নতুন বছরের শুরুতেই ঢাকাবাসী উপহার পেতে যাচ্ছে এক নিরবচ্ছিন্ন ও অত্যাধুনিক গণপরিবহন নেটওয়ার্ক। কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল পৌঁছানো মানেই হলো ঢাকার যাতায়াত ব্যবস্থায় গতির এক নতুন যুগের সূচনা, যা সাধারণ যাত্রীদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে সহজতর করার পাশাপাশি রাজধানীকে আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

বর্তমানে মেট্রোরেল মতিঝিল পর্যন্ত সেবা প্রদান করছে। তবে কমলাপুর রেলস্টেশনের সাথে সংযোগ স্থাপিত না হওয়ায় যাত্রীদের মতিঝিল থেকে রিকশা বা অন্য কোনো যানবাহনে কমলাপুরে যেতে হয়, যা বাড়তি সময় ও অর্থের অপচয় ঘটায়। মিরপুরের বাসিন্দা মো. আল-আমিন হোসেনের মতো হাজারও যাত্রীর প্রত্যাশা— মেট্রোরেল সরাসরি কমলাপুর পর্যন্ত পৌঁছালে তাদের যাতায়াত হবে আরও আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী।

প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল (এমআরটি লাইন-৬) পূর্ণাঙ্গরূপে চালু হলে দৈনিক যাত্রী পরিবহন ক্ষমতা ৬ লাখ ৭৭ হাজারে উন্নীত হবে। বর্তমানে মতিঝিল পর্যন্ত প্রতিদিন ৪ লাখেরও বেশি যাত্রী সেবা গ্রহণ করছেন।

মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশের উড়ালপথের মূল কাঠামোগত কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। কমলাপুরে মেট্রোরেলের জন্য নির্ধারিত স্টেশনের অবকাঠামোও দাঁড়িয়ে গেছে। বর্তমানে স্টেশনটিতে ফিনিশিং কাজ চলছে, যার মধ্যে রয়েছে টাইলস ও গ্রানাইট স্থাপন এবং রং করার কাজ। ডিএমটিসিএলের মাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত এই অংশের ভৌত কাজের অগ্রগতি ৭৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ। ৪ জুলাই থেকে রেললাইন বসানো এবং বিদ্যুতের খুঁটি ও তার স্থাপনের কাজ পুরোদমে শুরু হয়েছে। আগস্ট মাসের মধ্যেই এই পর্যায় শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

কমলাপুর পর্যন্ত লাইন সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল ২০২২ সালে এবং প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ২০২৫ সালের জুন মাস। তবে ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল কাজের জন্য ঠিকাদার নিয়োগে বিলম্বের কারণে প্রকল্পটি কিছুটা পিছিয়ে যায়। বিগত সরকারের সময়ে এই কাজের প্রস্তাবিত ব্যয় ছিল ৬৫১ কোটি টাকা। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেয় এবং দর-কষাকষির মাধ্যমে ব্যয় ১৮৬ কোটি টাকা কমিয়ে ৪৬৫ কোটিতে নামিয়ে আনে। এই কাজের জন্য ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ‘লারসন অ্যান্ড ট্যুবরো’কে দায়িত্ব প্রদান করা হয়।

প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব জানান, প্রকল্পটি দুটি বড় প্যাকেজে বিভক্ত। প্রথমটিতে রয়েছে উড়ালপথ ও স্টেশন নির্মাণ, আর দ্বিতীয় প্যাকেজে রয়েছে রেললাইন, সিগন্যালিং, বিদ্যুৎ ও অটোমেটিক ফেয়ার কালেকশন সিস্টেম। জাপানি কোম্পানি ‘নিপ্পন সিগন্যাল’ থেকে সংকেত ব্যবস্থার যন্ত্রপাতি আসার কথা রয়েছে। বিশ্বজুড়ে একই যন্ত্রের চাহিদা থাকায় কিছুটা সময়ক্ষেপণ হলেও বিকল্প হিসেবে অন্যান্য স্টেশনের যন্ত্রপাতি ব্যবহারের পরিকল্পনাও হাতে রেখেছে ডিএমটিসিএল। যেহেতু মতিঝিল পর্যন্ত অংশে দিনের বেলায় ট্রেন চলাচল করে, তাই কমলাপুর পর্যন্ত পরীক্ষামূলক চলাচল মূলত রাত ১২টার পর পরিচালনা করা হবে। এই কারণেই পরীক্ষামূলক সময়ের দৈর্ঘ্য কিছুটা দীর্ঘ হতে পারে।

এমআরটি লাইন-৬ প্রকল্পের অধীনে উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মোট দৈর্ঘ্য ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার এবং স্টেশনের সংখ্যা ১৭টি। প্রকল্পের মোট ব্যয় বর্তমানে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যার বড় একটি অংশ জাপানি সংস্থা জাইকার ঋণ হিসেবে এসেছে। ভবিষ্যতে উত্তরা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত আরও সাড়ে সাত কিলোমিটার মেট্রোরেল সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এছাড়া ঢাকাকে কেন্দ্র করে ছয়টি মেট্রোরেল লাইন নির্মাণে কাজ চলমান, যা ভবিষ্যতে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলবে। কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর, গাবতলী থেকে ভাটারা এবং মোহাম্মদপুর-কারওয়ানবাজার হয়ে দাশেরকান্দি পর্যন্ত বিস্তৃত লাইনগুলোর কাজ সম্পন্ন হলে ঢাকার যানজট নিরসনে আমূল পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চললে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকেই এক নতুন যুগে প্রবেশ করবে ঢাকার মেট্রো যোগাযোগ। যাত্রীবিহীন পরীক্ষামূলক যাত্রার সফল সমাপ্তি এবং এপ্রিলের নির্ধারিত সময়ে যাত্রী পরিবহনের মাধ্যমে কমলাপুর স্টেশন মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হবে। সাধারণ যাত্রীদের জন্য এটি হবে সময় বাঁচানোর সেরা মাধ্যম, যা ঢাকাবাসীর নাগরিক জীবনযাত্রাকে করবে আরও গতিশীল।