বিসিআইসির সার উৎপাদন ও চ্যালেঞ্জ

রুহেল হাশেমী প্রকাশিত: জুলাই ১৩, ২০২৬, ১২:৪৩ এএম
বিসিআইসির সার উৎপাদন ও চ্যালেঞ্জ

বিসিআইসির বর্তমান চেয়ারম্যান মো. ফজলুর রহমান দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তার প্রশাসনিক দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকেই বিসিআইসির প্রধান কার্যালয় থেকে শুরু করে কারখানা পর্যায় পর্যন্ত কর্মকর্তারা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি তৎপর।

চেয়ারম্যানের নির্দেশে বন্ধ কারখানাগুলোর বর্তমান অবস্থা, যান্ত্রিক ত্রুটি এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা হয়েছে। একই সাথে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে যাতে যমুনা বা সিইউএফএল’র মতো কারখানাগুলোতে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়। তবে এই পথ মোটেও মসৃণ নয়। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং অভ্যন্তরীণ গ্যাস কূপগুলোর উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার কারণে সার কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দেয়া সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংকট উত্তরণে গঠনমূলক সুপারিশমালা: দেশকে সারের স্বয়ংসম্পূর্ণতায় ফিরিয়ে আনতে এবং কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে বিসিআইসি ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের অতি দ্রুত কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, ‘জ্বালানি অগ্রাধিকার নীতি,সার কারখানাকে কেবল একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান হিসেবে না দেখে কৃষির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতোই সার কারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের জন্য জাতীয় কোটা নির্ধারণ করতে হবে। ‘পুরোনো কারখানার আধুনিকীকরণ, আশুগঞ্জ ও সিইউএফএল’র মতো জরাজীণকারখানাগুলোর পুরোনো যন্ত্রাংশ বদলে ঘোড়াশাল-পলাশের মতো আধুনিক প্রযুক্তিতে রূপান্তর করতে হবে, যা কম গ্যাসে দ্বিগুণ উৎপাদন দিতে সক্ষম।

‘আমদানি নির্ভরতা হ্রাস ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, যতদিন কারখানাগুলো পূর্ণ উৎপাদনে না ফিরছে, ততদিন স্পট মার্কেট (খোলা বাজার) থেকে চড়া দামে সার না কিনে জি-টু-জি (সরকার টু সরকার) চুক্তির মাধ্যমে কম মূল্যে সার বাফার গুদামে এনে আপদকালীন মজুত গড়ে তুলতে হবে।

জবাবদিহিতা ও তদারকি, চেয়ারম্যানের বর্তমান নীতি অনুযায়ী, কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পেছনে কোনো প্রশাসনিক অবহেলা বা দুর্নীতি থাকলে তার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) নীতি বজায় রাখতে হবে। সারের পর্যাপ্ত দেশীয় মজুত কেবল কৃষির উৎপাদনই বাড়ায় না, বরং তা দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে সুরক্ষিত করে। বিদেশ থেকে হাজার কোটি টাকার সার আমদানি সাময়িক সমাধান হতে পারে, কিন্তু তা কখনোই আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতির লক্ষণ নয়।

বিসিআইসির বর্তমান চেয়ারম্যান মো. ফজলুর রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং কর্মকর্তাদের সততা ও কর্মস্পৃহার মাধ্যমে দেশের বন্ধ সার কারখানাগুলো আবার প্রাণ ফিরে পাবে এটাই দেশের কোটি কৃষকের প্রত্যাশা। বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি। আর এই কৃষির উৎপাদনশীলতা ধরে রাখার প্রধান নিয়ামক হলো রাসায়নিক সার। এদেশের কৃষকদের মুখের অতি পরিচিত উক্তি দেশি সার মাটির উর্বরতা বাড়ায়, ফসল ফলায় সোনার মতো।

কিন্তু বাস্তব চিত্র আজ ভিন্ন। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর মতো সক্ষমতা ও অবকাঠামো থাকার পরও দেশের সিংহভাগ সরকারি সার কারখানা এখন বন্ধ কিংবা উৎপাদনহীন। ফলে হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে বিদেশ থেকে সার আমদানি করতে হচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতি ও কৃষি খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি) দেশের সার উৎপাদন ও সরবরাহের প্রধান দায়িত্বে নিয়োজিত।

সম্প্রতি বিসিআইসি’র চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বিসিএস (প্রশাসন) ১৮তম ব্যাচের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা মো. ফজলুর রহমান। ১৮ মে ২০২৫ খ্রি. তারিখে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে তিনি এবং তার অধীনস্থ কর্মকর্তারা বিসিআইসি’র প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও কাজের গতিশীলতা বাড়াতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। চেয়ারম্যানের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনায় মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কারখানার প্রকৌশলীরা উৎপাদন সচল করার প্রয়াস নিচ্ছেন সত্য, তবে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত গ্যাস সংকট, যান্ত্রিক ত্রুটি ও কাঁচামালের অভাব পুরো ব্যবস্থাকে স্থবির করে রেখেছে।

কৃষকদের প্রশ্ন এখন একটাই কেন দেশের সার কারখানাগুলো বন্ধ থাকবে আর কেন আমাদের বিপুল অর্থ দিয়ে নিম্নমানের কিংবা চড়া দামের বিদেশি সারের ওপর নির্ভর করতে হবে। উৎপাদন ও বন্ধের চালচিত্র, কোথায় দাঁড়িয়ে বিসিআইসি: বিসিআইসির অধীনে বর্তমানে দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানা রয়েছে। অথচ এর মধ্যে বর্তমানে সচল রয়েছে মাত্র ‘দুটি কারখানা। বাকি ৩টি বছরের পর বছর ধরে নানা সংকটে বন্ধ রয়েছে।

এ ছাড়া দেশের একমাত্র টিএসপি ও ডিএপি সার কারখানাও উৎপাদনহীন অবস্থায় পড়ে আছে। নিচে কারখানাগুলোর বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো— ১. ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার পিএলসি (জিপিএফপিএল) উৎপাদনে সচল: দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আধুনিক ও বৃহৎ পরিবেশবান্ধব এই কারখানাটি বর্তমানে চালু রয়েছে। এটি আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন হওয়ায় কম গ্যাস ব্যবহার করে বেশি ইউরিয়া উৎপাদন করতে সক্ষম। বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ ইউরিয়া চাহিদার একটি বড় অংশ এখান থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে। ২. শাহজালাল সার কারখানা (এসএফসিএল) উৎপাদনে সচল: সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে অবস্থিত এই আধুনিক কারখানাটি বিসিআইসির দ্বিতীয় সচল ইউনিট। যান্ত্রিক কিছু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বিসিআইসির বর্তমান প্রশাসনের কঠোর নজরদারিতে এই কারখানাটি থেকে নিয়মিত ইউরিয়া উৎপাদন ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে। ৩. যমুনা সার কারখানা (জেএফসিএল) বন্ধ: জামালপুরের তারাকান্দিতে অবস্থিত একসময়ের দেশের অন্যতম শীর্ষ দানাদার ইউরিয়া উৎপাদনকারী এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে বন্ধ রয়েছে। কারখানার যন্ত্রপাতি সচল থাকলেও কাঁচামাল বা গ্যাসের জোগান না থাকায় উৎপাদন শূন্য। ৪. আশুগঞ্জ সার কারখানা (এএফসিএল) বন্ধ: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে অবস্থিত এই পুরোনো কারখানাটি যান্ত্রিক ত্রুটি এবং ওভারহোলিং বা সংস্কারের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে অকেজো হয়ে পড়ে আছে। বারবার চালুর উদ্যোগ নেয়া হলেও কারখানার জরাজীর্ণ কাঠামোর কারণে তা সফল হচ্ছে না। ৫. চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানা (সিইউএফএল) বন্ধ: কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত এই গুরুত্বপূর্ণ কারখানাটি গ্যাস সংকটের প্রধান শিকার। বছরের অধিকাংশ সময় কারখানায় গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন বা চাপ কম থাকার কারণে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে।

৬. টিএসপি সার কারখানা (চট্টগ্রাম) বন্ধ: দেশের একমাত্র ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) সার কারখানাটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। ফসফোটিক সারের জন্য কৃষকদের শতভাগ আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ৭. ডিএপি সার কারখানা (ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট, চট্টগ্রাম) বন্ধ: নাইট্রোজেন ও ফসফেটের সমন্বয়ে গঠিত অত্যন্ত কার্যকরী ডিএপি সারের এই একমাত্র দেশীয় কারখানাটিও যান্ত্রিক বিপর্যয় ও গ্যাস সংকটের কারণে বর্তমানে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে।

‘আমদানির চড়া মূল্য এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপর চাপ: দেশে প্রতিবছর প্রায় ২৬ থেকে ৩০ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হয়। এর বাইরে ডিএপি, টিএসপি এবং এমওপি সারের চাহিদা রয়েছে আরও প্রায় ২৫-৩০ লাখ মেট্রিক টন। অথচ দেশের সবকটি কারখানা চালু থাকলে চাহিদার প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সার দেশেই উৎপাদন করা সম্ভব। বর্তমানে মাত্র দুটি ইউরিয়া কারখানা চালু থাকায় দেশের মোট চাহিদার চারভাগের একভাগও অভ্যন্তরীণভাবে মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রতিবছর কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও রাশিয়া থেকে লাখ লাখ টন সার আমদানি করতে হচ্ছে।

ডলার সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দামের ওঠানামার কারণে বাংলাদেশ সরকারকে বিপুল পরিমাণ ডলার খরচ করতে হচ্ছে, যা দেশের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করছে। ‘ভর্তুকর বোঝা, আমদানি করা সার চড়া মূল্যে কিনে দেশের কৃষকদের কাছে কম মূল্যে পৌঁছে দিতে সরকারকে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। কারখানাগুলো চালু থাকলে এই ভর্তুকির পরিমাণ অর্ধেকের নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব হতো।

কৃষকের আর্তি, দেশি সার জমির প্রাণ: বাংলাদেশের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাসায়নিক গুণাগুণের দিক থেকে দেশীয় কারখানায় উৎপাদিত দানাদার সার আমদানিকৃত সারের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকরী। আমদানিকৃত সার অনেক সময় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসায় এবং আর্দ্রতার কারণে জমাট বেঁধে যায়, যা জমিতে সমানভাবে ছিটানো যায় না।

কৃষকদের মতে, দেশি সার জমিতে দ্রুত দ্রবীভূত হয় এবং মাটির উর্বরতা শক্তি দীর্ঘস্থায়ী করে। জমি চাষের জন্য এই সার অত্যন্ত উপযোগী। যদি দেশের সবগুলো সার কারখানা নিয়মিত চালু থাকে, তবে সারের কোনো কৃত্রিম সংকট তৈরি হবে না। ডিলারদের সিন্ডিকেট বা খুচরা বাজারে সারের অতিরিক্ত মূল্য নেয়ার যে প্রবণতা প্রতি মৌসুমে দেখা যায়, দেশীয় উৎপাদন পর্যাপ্ত থাকলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বন্ধ হয়ে যাবে। কারখানাগুলোর চিমনি দিয়ে যখন আবার ধোঁয়া উড়বে, তখনই নিশ্চিত হবে বাংলাদেশের সাশ্রয়ী ও টেকসই কৃষি বিপ্লব।