বাংলাদেশি পণ্যের বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকার লড়াইয়ে গত অর্থবছরটি ছিল মিশ্র অভিজ্ঞতার। জাতীয় রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়া এবং সামগ্রিক আয়ে প্রবৃদ্ধির অভাব উদ্বেগজনক হলেও, বছরের শেষ মাসে কিছু খাত অভাবনীয় সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে।
বিশেষ করে জুন মাসের পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, বৈশ্বিক মন্দা ও অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশের উৎপাদনমুখী শিল্পগুলো নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গত অর্থবছরে সামগ্রিক রপ্তানি আয় প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। তবে এই নেতিবাচক ধারার বিপরীত চিত্র ফুটে উঠেছে জুনের প্রতিবেদনে। বছরের শেষ মাসে এসে পাট, চামড়া, কৃষিজাত ও প্রকৌশল পণ্যের মতো খাতগুলোতে যে উল্লম্ফন দেখা গেছে, তা বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত।
ইপিবি’র পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জুন মাসে কিছু খাত এককভাবে বড় প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে— পাট ও পাটজাত পণ্য: জুন মাসে এই খাত থেকে ৯ কোটি ৩ লাখ ডলার আয় হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৭৬.৬ শতাংশ বেশি। সোনালি আঁশের এই পুনরুত্থান বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব পণ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রতিফলন।
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য: জুন মাসে এই খাত থেকে ১২ কোটি ৮৭ লাখ ডলার আয় হয়েছে, যা ৪৭.৬৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। এটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলাফল। কৃষিজাত পণ্য: প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও কৃষিজাত পণ্য রপ্তানিতে ৪৬.৭৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, যা আয় দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ৯৬ লাখ ডলার।
প্রকৌশল পণ্য: জুন মাসে এই খাত থেকে ৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার আয় হয়েছে, যার প্রবৃদ্ধির হার ৪৪.৭৪ শতাংশ। জাহাজ রপ্তানি: সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে জাহাজ শিল্পে, যা প্রায় ৭০০ শতাংশ। যদিও আয়ের পরিমাণ অন্যান্য বড় খাতের তুলনায় কম, তবুও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতা এই বিশাল প্রবৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
রপ্তানি আয়ের এই উল্লম্ফনকে কেবল সাময়িক সাফল্য বলা যাবে না। দীর্ঘকাল ধরে পাট ও চামড়া শিল্পকে আধুনিকায়নের যে প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে, তা এখন সুফল দিতে শুরু করেছে। এ ছাড়া, সরকার বস্ত্র খাতে নগদ সহায়তা ৫ শতাংশে উন্নীত করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটি অন্যান্য সংশ্লিষ্ট খাতের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও কাঁচামালের দামের ঊর্ধ্বগতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়ি বা ‘এক্সপোর্ট বাস্কেট’ বৈচিত্র্যময় করার যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, এই প্রবৃদ্ধি তারই প্রাথমিক ফলাফল। প্রকৌশল পণ্য ও জাহাজ শিল্পের প্রসার প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ কেবল তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে উচ্চমূল্যের প্রযুক্তিগত পণ্যের দিকে ঝুঁকছে।
সরকার যদি নিয়মিত প্রণোদনা এবং সহজ শর্তে ঋণের প্রবাহ বজায় রাখতে পারে, তবে এই গতিধারা আগামী অর্থবছরগুলোতে আরও বেগবান হবে। রপ্তানি বাণিজ্যে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়া অবশ্যই একটি সতর্কবার্তা। তবে জুন মাসের এই ইতিবাচক প্রবণতা প্রমাণ করে যে, উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা ও মানসম্মত উৎপাদন ব্যবস্থা বজায় থাকলে বৈশ্বিক প্রতিকূলতা জয় করা সম্ভব। পাট ও চামড়া খাতের এই বড় উল্লম্ফন কেবল আয়ের পরিসংখ্যান বাড়াচ্ছে না, বরং এটি একটি টেকসই রপ্তানি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার প্রেরণা যোগাচ্ছে।
এখন প্রয়োজন হলো, এই প্রবৃদ্ধি যেন ধারাবাহিক থাকে তা নিশ্চিত করা। নীতিনির্ধারকদের উচিত ছোট ও মাঝারি শিল্পগুলোকে আরও বেশি সহায়তা দেয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়াতে আরও কার্যকর কূটনৈতিক ও ব্যবসায়িক উদ্যোগ গ্রহণ করা। আগামী দিনগুলোতে এই প্রবৃদ্ধি যদি টেকসই হয়, তবেই বাংলাদেশ তার লক্ষ্যমাত্রা পূরণের পথে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন