অপরাধ নেটওয়ার্ক ভাঙ্গা ও ডিএমপির চ্যালেঞ্জ

রুহেল হাশেমী প্রকাশিত: জুলাই ১৩, ২০২৬, ০৯:৪৬ পিএম
অপরাধ নেটওয়ার্ক ভাঙ্গা ও ডিএমপির চ্যালেঞ্জ
  • কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদের দূরদর্শী নেতৃত্ব ও ডিএমপির দৃশ্যমান রূপান্তর
  • অপরাধ দমনের কৌশল সাদা পোশাকে সিভিল ডিউটির ম্যাজিক

নতুন কমিশনারের যোগদানের পর সবচেয়ে বড় দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে সাধারণ অপরাধ দমনের কৌশলে। ঢাকা মহানগরীর অলিগলি, বাসস্ট্যান্ড ও জনবহুল এলাকায় চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের উপদ্রব কমাতে প্রথাগত টহল পুলিশের পাশাপাশি ‘সিভিল ডিউটি’ বা সাদা পোশাকে নজরদারি বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে।

১. অপরাধীদের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি: অপরাধীরা সাধারণত পুলিশ ভ্যান বা ইউনিফর্ম পরিহিত পুলিশ দেখে স্থান পরিবর্তন করে বা সাময়িকভাবে লুকিয়ে পড়ে। কিন্তু সাদা পোশাকে ডিএমপির বিশেষ টিম ও ডিবির সদস্যরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে থাকায় অপরাধীরা বুঝতে পারছে না কে সাধারণ নাগরিক আর কে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য। এই কৌশলগত অনিশ্চয়তা অপরাধ চক্রের ভেতরে তীব্র আতঙ্ক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছে।

২. হাতেনাতে অপরাধী গ্রেপ্তার ও চক্রের মূল হোতা চিহ্নিতকরণ: জনাকীর্ণ স্থান, বাজার ও লোকাল বাসের রুটগুলোতে সাদা পোশাকের পুলিশ সক্রিয় থাকার কারণে ছিনতাইকারী ও পকেটমারদের হাতেনাতে ধরা সম্ভব হচ্ছে। কেবল সাধারণ চোর-ছিনতাইকারীই নয়, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এদের পেছনে থাকা গডফাদার ও চোরাই মাল কেনাবেচার সিন্ডিকেটগুলোকে গুঁড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। ফলে মহানগরের ভেতরের অপরাধের গ্রাফ উল্লেখযোগ্য অংশে নেমে এসেছে। ৩. বিশেষায়িত উইংয়ের সক্রিয় ভূমিকা: খুন, মাদক চোরাচালান ও সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে ডিবি পুলিশের অভিযান জোরদার করা হয়েছে।

অন্যদিকে উগ্রবাদ ও সাইবার অপরাধ দমনে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট এবং নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ‘উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন’ সমন্বিতভাবে কাজ করছে। এর ফলে পারিবারিক সহিংসতা থেকে শুরু করে বড় ধরনের নাশকতা প্রতিরোধ করা সহজতর হয়েছে। একটি দেশের সার্বিক স্থায়িত্ব ও অর্থনৈতিক গতিশীলতা বহুলাংশে নির্ভর করে তার রাজধানী শহরের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর। বাংলাদেশের হদপিণ্ড ঢাকা মহানগরীও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রায় দুই কোটিরও বেশি মানুষের এই মেগাসিটিতে নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয়া সবসময়ই একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ।

এই গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) নতুন কমিশনার হিসেবে সম্প্রতি যোগদান করেছেন অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাবেক প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নিযুক্ত এই দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই ঢাকার আইনশৃঙ্খলার পটভূমিতে এক ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা যেমন চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি এবং তীব্র যানজট নিরসনে তার গৃহীত সুনির্দিষ্ট কৌশল ও মাঠপর্যায়ের কঠোর তদারকি নগরবাসীকে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।

সাংগঠনিক কাঠামো ও সমন্বিত চেইন অব কমান্ডের কার্যকারিতা: ডিএমপির নতুন কমিশনারের সফলতার মূল চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে বাহিনীর চেইন অব কমান্ড বা প্রশাসনিক স্তরবিন্যাসকে শতভাগ সচল ও জবাবদিহিমূলক করার মধ্যে। কমিশনার হিসেবে তিনি শুধু নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং প্রতিটি স্তরের পুলিশ কর্মকর্তাদের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও জবাবদিহিতা নির্ধারণ করে দিয়েছেন।


কমিশনারের দূরদর্শী নেতৃত্ব ডিএমপির প্রধান হিসেবে তিনি সামগ্রিক পুলিশ প্রশাসনকে একটি সমন্বিত ছাতার নিচে এনেছেন। সরকারের আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত নির্দেশনা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে তিনি শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) নীতি গ্রহণ করেছেন। অতিরিক্ত ও যুগ্ম কমিশনারদের কঠোর তদারকি, অপরাধ ও অপারেশন, গোয়েন্দা (ডিবি), ট্রাফিক এবং প্রশাসন ও লজিস্টিকসের মতো বৃহৎ বিভাগগুলোর প্রধানদের মাধ্যমে দৈনন্দিন কার্যক্রমের নিবিড় পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা হয়েছে। নির্দিষ্ট জোন ও বিশেষায়িত ইউনিটের যৌথ সমন্বয়ে অপরাধের হটস্পটগুলো চিহ্নিত করা সহজ হয়েছে।


উপকমিশনার (ডিসি) ও ওসি লিংকের সক্রিয়করণ, ঢাকা মেট্রোপলিটনের প্রতিটি ক্রাইম ও ট্রাফিক জোনের উপকমিশনারদের সরাসরি মাঠপর্যায়ে জবাবদিহি করতে হচ্ছে। বিশেষ করে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) সাধারণ ডায়েরি (জিডি) গ্রহণ, মামলা রুজু এবং দ্রুত তদন্তের ক্ষেত্রে গতিশীলতা আনার নির্দেশ দেয়ায় সাধারণ মানুষের পুলিশের প্রতি আস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে। যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন: ঢাকার অন্যতম প্রধান অভিশাপ হলো তীব্র যানজট, যা প্রতিদিন লাখ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট করে।

নতুন কমিশনারের দায়িত্ব গ্রহণের পর ট্রাফিক বিভাগে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, যা মূলত সরকারের মহতি উদ্যোগ এবং ট্রাফিক পুলিশের কঠোর শৃঙ্খলার ফসল। সিগন্যাল বাতির কার্যকর ব্যবহার ও চালকদের স্বস্তি: দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থা হাতের ইশারায় পরিচালিত হয়ে আসছিল, যা ছিল চরম অনাধুনিক ও সময়সাপেক্ষ। বর্তমান প্রশাসনের উদ্যোগে ট্রাফিক সিগন্যাল বাতিগুলোর স্বয়ংক্রিয় ও পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। এর সুফল সরাসরি পাচ্ছেন গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত গাড়ির চালকরা। একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট করা যায়।

রাস্তায় চলাচলকারী একজন নিয়মিত চালক জানান, আগে যে রুটে অফিসে যেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হতো, আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা এবং মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের কঠোর নজরদারির কারণে এখন অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। অযথা মোড়গুলোতে গাড়ি আটকে থাকার প্রবণতা কমেছে।

ফুটপাত দখলমুক্তকরণ ও যত্রতত্র পার্কিং বন্ধ: যানজটের অন্যতম কারণ হলো অবৈধ পার্কিং এবং ফুটপাত দখল করে দোকানপাট বসানো। উপকমিশনার (ট্রাফিক) ও মাঠপর্যায়ের সার্জেন্টদের নির্দেশনার মাধ্যমে মূল সড়কগুলো সচল রাখা হচ্ছে এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করানোর কারণে বাসগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অভাবনীয় উন্নতির মূল কারণসমূহ: ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদের যোগদানের পর ঢাকার সামগ্রিক পরিস্থিতির এই ইতিবাচক মোড় নেয়ার পেছনে মূলত কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ কাজ করেছে। ডিএমপির সফলতার চতুর্মুখী স্তম্ভ: ১. কঠোর জবাবদিহিতা ২. আধুনিক প্রযুক্তি (ওসি থেকে ডিসি পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ে সিসিটিভি, সাইবার ট্র্যাকিং সরাসরি তদারকি ও ডাটাবেজভিত্তিক তদন্ত) ৩. সাদা পোশাকে নজরদারি ৪. ট্রাফিক আধুনিকায়ন (ছিনতাই ও ডাকাতি রোধে সিভিল স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ও গতি,  ডিউটির ব্যাপক প্রসার নিয়ন্ত্রণে কঠোরতা)।

অভিজ্ঞতা ও পেশাদারিত্বের সংমিশ্রণ: মোসলেহ উদ্দিন আহমদ সিআইডির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের কারণে অপরাধের উৎস, তদন্তের ত্রুটি এবং অপরাধীদের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন। সেই অভিজ্ঞতাকে তিনি ডিএমপির বিশাল জনবল পরিচালনার ক্ষেত্রে নিখুঁতভাবে প্রয়োগ করছেন।


মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মনোবল বৃদ্ধি, সততা ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করা পুলিশ সদস্যদের পুরস্কৃত করা এবং গাফিলতির ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক বিভাগীয় ব্যবস্থার কারণে পুরো বাহিনীর কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। জনমুখী ও তথ্যনির্ভর পুলিশিং, সাধারণ জনগণের সঙ্গে দূরত্বের দেয়াল ভেঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান সহজ করা হয়েছে।

সিভিল ডিউটিতে থাকা পুলিশ সদস্যরা সরাসরি নাগরিকদের ভোগান্তির কথা জানতে পারছেন, যা দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সহায়তা করছে। ভবিষ্যৎ রূপকল্প ও টেকসই নিরাপত্তার প্রত্যয়: ডিএমপি কমিশনার স্পষ্ট করে বলেন, বর্তমানের এই অর্জন কেবল শুরু। ঢাকা মহানগরীকে পুরোপুরি নিরাপদ ও অপরাধমুক্ত করতে আরও অনেক দূরদর্শী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। অপরাধীদের প্রযুক্তিনির্ভর নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে সিসিটিভি নজরদারি বাড়ানো, কিশোর গ্যাং কালচার নির্মূল করা এবং মাদকের বিস্তার রোধে পাড়া-মহল্লায় বিশেষ ব্লকেড রেইড পরিচালনা করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে।


তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে জাানান, পুলিশ ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এবং সরকারের উন্নয়ন নীতির সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকা একটি আদর্শ, নিরাপদ এবং যানজটমুক্ত মেগাসিটি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। একটি শহরের আইনশৃঙ্খলা কেবল পুলিশের দায়িত্ব নয়, এটি নাগরিকদের স্বস্তিদায়ক জীবনযাত্রার মৌলিক অধিকার। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের নতুন কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, সিভিল ডিউটির কৌশলগত প্রয়োগ এবং ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন প্রমাণ করেছে যে সদিচ্ছা, সঠিক পরিকল্পনা এবং কঠোর তদারকি থাকলে যেকোনো স্থবির সংস্থাকে গতিশীল করা সম্ভব।

চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির ভীতি কাটিয়ে এবং যানজটের ক্লান্তি দূর করে ঢাকা মহানগরী এখন একটি নিরাপদ ও আধুনিক রাজধানীর দিকে ধাবিত হচ্ছে। কমিশনারের এই দূরদর্শী পদক্ষেপগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আগামী দিনগুলোতে ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও সুদৃঢ় ও টেকসই হবে, যা সমগ্র দেশের অগ্রযাত্রায় অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।