আইনের মুখেও বাল্যবিবাহের দাপট

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জুলাই ২৩, ২০২৬, ১২:১৯ এএম
আইনের মুখেও বাল্যবিবাহের দাপট

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ রোধে সুনির্দিষ্ট আইন ও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানা সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু থাকা সত্ত্বেও থামছে না এই সামাজিক ব্যাধি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক তহবিল (ইউনিসেফ)-এর যৌথ জরিপের উদ্বেগজনক তথ্যানুযায়ী, দেশে এখনো ৫৬ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। কঠোর আইন প্রয়োগের ঘাটতি, দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব এবং অভিভাবকের অসচেতনতার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে, যা সামগ্রিক নারী শিক্ষা এবং মাতৃমৃত্যুর হারের ওপর অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফ কর্তৃক পরিচালিত যৌথ জরিপের তথ্যানুযায়ী, অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বিয়ের কারণে দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে কিশোরী মাতৃত্বের হার।

কিশোরী মাতৃত্বের সূচক: দেশে বর্তমানে প্রতি ১ হাজার জন অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীর মধ্যে ৯২ জন মা হচ্ছে। স্বাস্থ্যগত জটিলতা: বয়সের আগেই মা হওয়ার কারণে এসব কিশোরীর শরীরে পুষ্টির চরম ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। কম বয়সে সন্তান ধারণের কারণে মাতৃমৃত্যু ও নবজাতকের মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।

শিক্ষায় প্রভাব: বাল্যবিবাহের শিকার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অধিকাংশ কিশোরীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি ঘটছে, যা তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ চিরতরে বন্ধ করে দিচ্ছে। মাঠপর্যায়ে বাল্যবিবাহের প্রাদুর্ভাব কতটা ভয়াবহ, তা ফুটে উঠেছে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর তথ্যে। বাল্যবিবাহ বন্ধে সাধারণ মানুষ এখন অনেকটাই সোচ্চার হলেও বিয়ের আয়োজন বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপ নিয়মিত প্রয়োজন হচ্ছে। ২০২৬ (প্রথম ৬ মাস): চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ৯৯৯-এর মাধ্যমে ১ হাজার ৮২৬টি বাল্যবিবাহ সংক্রান্ত জরুরি সেবা দেয়া হয়েছে এবং বহু বিবাহ বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে।

২০২৫ (পুরো বছর): বিগত ২০২৫ সালে এই সেবার সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৪৫টি। জাতীয় জরুরি সেবার তথ্য প্রমাণ করে যে, সমাজে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে প্রতিবেশীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়লেও অভিভাবকদের একাংশের মানসিকতায় পরিবর্তন আসেনি। বাংলাদেশে ব্রিটিশ আমলে ১৯২৯ সালে প্রথম বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন প্রণয়ন করা হয়। পরে স্বাধীন বাংলাদেশে সময়ের প্রয়োজনে কয়েক দফা সংশোধনের পর ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭’ পাস করা হয়।

এই আইনে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের বিয়ে দেয়া বা বাধ্য করাকে স্পষ্টত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আইন থাকা সত্ত্বেও এর পুরোপুরি প্রতিফলন না ঘটার পেছনে বেশ কয়েকটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা— ১. দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা: দরিদ্র পরিবারগুলো মেয়েসন্তানকে অতি দ্রুত বিয়ে দিয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক বোঝা কমানোর পথ হিসেবে দেখে।

২. সামাজিক কুসংস্কার ও নিরাপত্তা শঙ্কা: চরাঞ্চল ও গ্রামীণ এলাকায় মেয়েদের সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবকদের অযথা উদ্বেগ বাল্যবিবাহের বড় অনুঘটক। ৩. ভুয়া জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেট: অসাধু কাজি ও জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় ভুয়া জন্মসনদ বানিয়ে বয়স বাড়িয়ে বিয়ের আয়োজন করা এখনো বন্ধ হয়নি।

বাল্যবিবাহের শিকার হওয়া শিশুদের মানসিক ও শারীরিক অপরিপক্বতার বিষয়টি তুলে ধরে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সামাজিক ব্যক্তিত্ব ও সরকারি নীতি-নির্ধারকরা।

অ্যাকশন এইড এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, ‘একটি মেয়ে যখন শারীরিক ও মানসিকভাবে সংসারের ভার নেয়ার জন্য মোটেও প্রস্তুত নয়, ঠিক তখনই তাকে এক জোরপূর্বক বিয়ের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে ১৩ বা ১৪ বছর বয়সেই একটি মেয়ে মা হয়ে যাচ্ছে, যা কোনো সভ্য সমাজে মেনে নেয়া কঠিন। এর ফলে মেয়েটির মানসিক ও শারীরিক বিকাশ পুরোপুরি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’

সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব বলেন, ‘শিক্ষার অভাব এবং ভুল সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিই বাল্যবিবাহের মূল কারণ। সংকট মোকাবিলায় আমরা দেশের ৪৯৫টি উপজেলায় আনুষ্ঠানিকভাবে শিশু কল্যাণ বোর্ডকে কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছি। এ ছাড়া ইউনিয়ন পর্যায়ে অভিভাবকদের জন্য ‘পজিটিভ প্যারেন্টিং’ নামের বিশেষ প্রশিক্ষণ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে বাবা-মায়েরা বুঝতে পারেন কীভাবে শিশুদের অধিকার রক্ষা করে বড় করতে হয়।’

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল আইনি কঠোরতা দিয়ে এই ব্যাধি নিরাময় সম্ভব নয়। বাল্যবিবাহের হার শূন্যে নামিয়ে আনতে বহুমাত্রিক উদ্যোগ প্রয়োজন— তৃণমূল পর্যায়ে মনিটরিং: স্থানীয় কাজি, ইউপি সদস্য ও সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে মনিটরিং সেল গঠন করা। কিশোরী ভাতা ও উপবৃত্তি বাড়ানো: মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে উপবৃত্তি ও প্রণোদনা বৃদ্ধি করা। কঠোর শাস্তি নিশ্চিতকরণ: ভুয়া তথ্য দিয়ে বিয়ে সম্পাদনকারী কাজি ও অসাধু অভিভাবকদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান।

সর্বোপরি, একটি দেশের মোট নারী জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি যদি ১৮ বছর বয়সের আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য হয়, তবে সেই দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা কঠিন। বাল্যবিবাহ কেবল একটি আইনি বা সামাজিক অপরাধ নয়, এটি সরাসরি মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।

২০১৭ সালের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের ফাঁকফোকর বন্ধ করে কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সমাজসেবা অধিদপ্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। কন্যাসন্তানদের বোঝা না ভেবে সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার মানসিকতা সমাজে তৈরি হলেই কেবল এই করুণ পরিসংখ্যান পরিবর্তন করা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা বলেন।