ঈদে নগরে কিশোর গ্যাং আতঙ্ক

আবু ছালেহ আতিফ প্রকাশিত: এপ্রিল ১৭, ২০২৩, ১২:২৯ এএম
ঈদে নগরে কিশোর গ্যাং আতঙ্ক
  • নীরব সময়ে তৎপর হয়ে ওঠে তারা
  • স্থানীয় বড় ভাইদের দ্বারা প্রভাবিত
  • অধিকাংশই নেশায় আসক্ত
     

ঈদ সামনে রেখে পুলিশের ফোর্স বাড়ানো হয়েছে
—এ কে এম হাফিজ আক্তার, অতি. কমিশনার, ডিএমপি

কিশোর অপরাধ কমাতে সাংস্কৃতিক চর্চার প্রয়োজন
—অধ্যাপক ড. আজহারুল ইসলাম, শিক্ষক, ঢাবি

সাহরির পর ফজরের নামাজ শেষে ঘুমে কাতর নগরবাসী। এমন সময় সকাল ৫টার দিকে কমলাপুরের উদ্দেশে যাচ্ছিলেন জামাল। পুরান ঢাকার বানিয়ানগরে বাসা তার। মুরগীটোলা মোড়ে দাঁড়িয়ে রিকশার জন্য অপেক্ষা করছিলেন তিনি। ঠিক তখনই কিছু কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য তাকে ভয় দেখিয়ে ছিনিয়ে নেয় টাকা ভর্তি মানিব্যাগ। কিন্তু ভাগ্যক্রমে আশপাশ থেকে কোথাও একটা গলার আওয়াজে মোবাইল না নিয়েই পালিয়ে যান কিশোর গ্যাংয়ের প্রায় পাঁচ-সাতজন। পরবর্তীতে কোনোভাবে কমলাপুর রেলস্টেশনে যান এ ভুক্তভোগী। তবে সময় স্বল্পতার কারণে এবং ঝামেলা এড়াতে তিনি কোনো আইনি পদক্ষেপে যাননি তাৎক্ষণিক এবং পরবর্তীতেও। এমন পরিস্থিতিতে আরও অনেকেই পড়ছেন। একই স্থানে (মুরগীটোলা) গত ২৮ মার্চ মোবাইল চুরিকে কেন্দ্র করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হামলা করে স্থানীয় কিশোর গ্যাং। যেখানে কয়েকজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।

শুধু এটাই নয়, সারা বছরের মতো রমজান মাসেও রাজধানীজুড়েই চলছে ‘কিশোরগ্যাংয়ের এমন অনেক অপতৎপরতা। এরা বিভিন্ন এলাকায় বড় বড় অপরাধ করছে স্থানীয় বিভিন্ন দলের নেতাদের প্রশ্রয়ে— বলছেন ভুক্তভোগী এবং সচেতন সমাজ। জানা গেছে, বিশেষ উৎসব এলে এসব কিশোরগ্যাংয়ের বেপরোয়া ছিনতাই বেড়ে যায়। পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা খুব চাতুরতার সাথে নীরব সময়গুলোতে এসব আক্রমণ করে। এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেয়া তথ্য মতে, রাজধানীতে বেপরোয়া হয়ে উঠা কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা তিন হাজারেরও বেশি। মোটকথা, বর্তমানে নগরবাসীর জন্য অন্যতম দুশ্চিন্তার কারণ এই কিশোরগ্যাং।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসূত্র বলছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে গড়ে উঠছে এ সব কিশোরগ্যাং। তারা বিভিন্ন অপরাধ সংগঠনের পাশাপাশি নিজেদের একটা জগত তৈরি করেছে। বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় তৈরি হওয়া কিশোরগ্যাং নিজেদের তৈরি করা সাংকেতিক ভাষায় তথ্য আদান-প্রদান করে। বিগবস, নাইন এমএম, নাইন স্টার, ডিসকো বয়েজ ইত্যাদি নামে পরিচিত ‘কিশোরগ্যাং’ আধিপত্য বিস্তার, ছিনতাই, চুরি পাড়া বা মহল্লার রাস্তায় মোটরসাইকেলের ভয়ংকর মহড়া, মাদক এবং ইয়াবা সেবন ও বিক্রি, চাঁদাবাজি, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার মতো বড় বড় অপরাধের সাথে জড়িত। পুলিশের তালিকা অনুযায়ী রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি কিশোরগ্যাং রয়েছে মিরপুর এলাকায়। এ ছাড়া তেজগাঁও, উত্তরা, গুলশান, ওয়ারী, সায়দাবাদ, মতিঝিল, রমনা, লালবাগ, গাবতলী, মহাখালী, বাড্ডা, রামপুরা, আজিমপুর, হাতিরঝিল পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় তারা খুবই তৎপর। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক র্যাবের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা আমার সংবাদকে বলেন, আসলে প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীরা সাহস দিয়ে কিশোরদের ব্যবহার করে অপরাধ করায়। এসব কিশোররাও উঠতি বয়সের কারণে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে প্রতিযোগিতা করে অপরাধ করে। মূলত, তারা মারামারি, জমি দখল, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল এবং এদের কেউ কেউ আবার মাদকের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে এসব কিশোরগ্যাং তৈরি করেছে।

ডিএমপির দায়িত্বশীল কিছু কর্মকর্তার সাথে এ সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা বলেন, আসলে প্রচলিত শিশু আইনে কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া অনেকটাই জটিল ছিল। এর জন্য বয়স্ক অপরাধীরা চাতুরতার সঙ্গে আইনের আওতা থেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে এসব কিশোরগ্যাংয়ের সৃষ্টি করে। কিন্তু বর্তমান আইন অনুযায়ী কিশোর অপরাধীদের সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। তবে সেখানে তারা কতখানি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে সেটা বলা যায় না। 

কিশোরদের কোমল মনেও এত অপরাধ প্রবণতা কেন জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আজহারুল ইসলাম আমার সংবাদকে বলেন, শুরুতে অ্যাডভেঞ্চার বা কৌতূহল উদ্দীপক হিসেবে কিশোররা সমবয়সিদের সঙ্গে সময় কাটাতে এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ কাজ করতে পছন্দ করে। যথাযথ পারিবারিক এবং সামাজিক মনিটরিং না থাকলে, কিশোরদের সেই বৈচিত্র্যময় কাজগুলো নেতিবাচক কাজে পরিণত হয়, যা গ্যাং কালচার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এসব কাজ এবং এর ফলে যে নেতিবাচক প্রচারণা হয়, সেগুলোও তাদের আরও ভয়াবহ অপরাধের দিকে ধাবিত করে।

কিভাবে তারা এর থেকে বের হতে পারে জানতে চাইলে ড. আজহারুল ইসলাম বলেন, সুদৃঢ় পারিবারিক কাঠামো, যত্নশীল সামাজিক ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক নজরদারি জোরদার করার মাধ্যমে কিশোর অপরাধ কমিয়ে আনা যায়। এছাড়াও পর্যাপ্ত খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক চর্চার ব্যবস্থা করাও আশু প্রয়োজন।

ইদানিং ঈদ সামনে রেখে বিভিন্ন এলাকায় এসব কিশোরগ্যাংয়ের জমাট দেখা যাচ্ছে এবং তাদের লক্ষ্যও থাকে বিভিন্ন উৎসব। এ সম্পর্কে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান কি থাকবে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অ্যাডমিন) এ কে এম হাফিজ আক্তার আমার সংবাদকে বলেন, এ জন্য বিভিন্ন জায়গায় আমাদের পুলিশের ফোর্স বাড়ানো হয়েছে। টহল টিম বাড়ানোর পরও মাঝেমাঝে একটু সমস্যা হচ্ছে। তিনি বলেন, দু-একদিনের ভেতর যখন ঢাকা শহর ফাঁকা হয়ে যাবে, তখন আমাদের ফোর্সরা আরও ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে এ সম্পর্কে সজাগ থাকবে। যেন বাসাবাড়িতে চুরি-ডাকাতি না হয়। এবং বিভিন্ন মার্কেটে আমাদের ব্যাপক ফোর্স দেয়া হয়েছে। 

অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর (ডিএমপির) নতুন কোনো পরিকল্পনা বা বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে হাফিজ আক্তার বলেন, যদিও কিছু দুর্ঘটনা ঘটে যায় তবে আমরা আশা করছি, অন্যান্য বছর যেমন নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভালো গেছে, এ বছর আরও ভালো যাবে আশা করছি। এবং সর্বোপরি আমাদের গ্রেপ্তার অভিযান নিয়মিত চলছে।