সময়ের নদী থেমে থাকে না। বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে, পরীক্ষার হলে ঘাম ঝরাতে ঝরাতে আর ফলাফলের অপেক্ষায় বুক ধুকপুক করতে করতেই কেটে গেছে দীর্ঘ সময়। চার দশক আগে যে বন্ধুত্বের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল স্কুলের বেঞ্চে, পরীক্ষার খাতায় আর ফলাফল বোর্ডের সামনে, সময় পেরিয়ে আজ তা পরিণত হয়েছে গভীর মানবিক সম্পর্কের এক দৃঢ় বন্ধনে। সেই বন্ধনেরই উৎসবমুখর প্রকাশ ঘটতে যাচ্ছে আগামী শুক্রবার।
রাজধানীর পূর্বাচল ক্লাবে দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য মিলনমেলায় একত্র হচ্ছেন ১৯৮৬ সালে এসএসসি পাস করা বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা।
কিছু স্মৃতি আছে যা সময়ের স্রোতে ভেসে যায় না। স্কুলের করিডোরে বন্ধুর ডাক, টিফিনের টেবিলে ভাগ করা শেষ বিস্কুট কিংবা বিদায়ের দিনে চাপা কণ্ঠে বলা, ‘আবার দেখা হবে’ সেই প্রতিশ্রুতিরই এক পূর্ণতা পেতে যাচ্ছে এই আয়োজন। বিশ্বজুড়ে করোনার প্রাদুর্ভাবের সময় ১৯৮৬ সালে এসএসসি পাস করা শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘এসএসসি-১৯৮৬ বাংলাদেশ’ নামক সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সংগঠনের ষষ্ঠ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং এসএসসি পাসের ৪০ বছর পূর্তি তথা রুবি জয়ন্তী উপলক্ষে এই দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য মিলনমেলার আয়োজন করা হয়েছে। এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়; এটি চার দশকের পথচলার এক আবেগঘন পুনর্মিলন, যেখানে স্মৃতি কথা বলে, চোখ ভিজে আসে আর হাসির ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে থাকে নীরব দীর্ঘশ্বাস।
নির্ধারিত দিন সকাল আটটায় বন্ধুদের আগমনের মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হবে। সকাল সাড়ে আটটায় ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বের করা হবে বর্ণিল র্যালি। এটি যেন সময়ের বুক চিরে হাঁটা কিছু মানুষের নীরব ঘোষণা ‘আমরা এখনও আছি, একসঙ্গেই আছি’। অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন সাবেক ছাত্রদল সভাপতি সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু। জাতীয় সংগীতের সুরে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মুহূর্তে হয়তো অনেকের চোখের কোণে জমে উঠবে পুরোনো দিনের শ্রদ্ধা আর গর্ব। উদ্বোধনী অধিবেশনে জাতীয় ও সংগঠনের পতাকা উত্তোলন এবং সভাপতির স্বাগত বক্তব্যের পাশাপাশি থাকবে প্রয়াত বন্ধুদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা। সেই নীরবতায় ভেসে উঠবে হারিয়ে যাওয়া মুখগুলো, যারা আজ নেই কিন্তু স্মৃতিতে অমলিন।
এছাড়া অসুস্থ বন্ধুদের সুস্থতা কামনায় দোয়া আর সংগঠনের থিম সং মিলনমেলার আবহকে করে তুলবে আরও মানবিক।
এই মিলনমেলার এক অনন্য আকর্ষণ হলো স্মরণিকা ‘৮৬-র দর্পণ ২০২৬’ এর মোড়ক উন্মোচন। এটি কেবল একটি প্রকাশনা নয়, এটি এক আয়না যেখানে দেখা যাবে কৈশোরের স্বপ্ন, যৌবনের সংগ্রাম আর প্রৌঢ়ত্বের প্রাপ্তি। দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও প্রবাস থেকে আসা কয়েক হাজার বন্ধু এই আয়নায় একবার চোখ রাখতে জড়ো হবেন।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে পরিচিতি আর ফটোসেশনের মধ্য দিয়ে পরিচয়ের পুনর্জন্ম ঘটবে। নাম মনে না পড়লেও হাসি, কণ্ঠস্বর কিংবা পুরোনো কোনো ডাকনামে চিনে নেওয়া যাবে বহুদিনের বন্ধুদের। দুপুরের বিরতির পর সাংস্কৃতিক পর্বে গান, কবিতা আর স্মৃতিচারণে মিলনমেলা রূপ নেবে এক আবেগঘন উৎসবে।
সম্মাননা প্রদান, র্যাফল ড্র আর সন্ধ্যার সাংস্কৃতিক আয়োজন মিলনমেলাকে এনে দেবে পূর্ণতা। রাত আটটায় আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হলেও শেষ হবে না গল্প, শেষ হবে না বন্ধুত্ব।
সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ব্যারিস্টার ড. গাজী সিরাজুল ইসলাম বলেন, চার দশক পেরিয়েও আমরা একে অন্যের পাশে থাকতে চাই। এ মিলনমেলা সেই চাওয়ারই উৎসব। সময় আমাদের বদলে দেয়, কিন্তু কিছু সম্পর্ক সময়কে হার মানায়।
এসএসসি-১৯৮৬ বন্ধুদের এই মিলনমেলা সেই অবিনশ্বর বন্ধুত্বেরই এক উজ্জ্বল উদযাপন, যেখানে অতীত এসে হাত ধরে বর্তমানের সঙ্গে ভবিষ্যতের পথে হাঁটে।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন