ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের (মসিক) প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। জন্মসনদ থেকে শুরু করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—নগরের সব খাতে নাগরিক সেবা কার্যত ‘লাইফ সাপোর্ট’-এর উপর নির্ভর করছে। কর্মকর্তা–কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা, আর সাধারণ নাগরিকদের ভোগান্তি চরমে উঠেছে।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুমনা আল মজীদ একসাথে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে দক্ষতার অভাব ও এককেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডে ক্ষোভ বেড়েছে।
সম্প্রতি ৩৩ জন কর্মকর্তাকে চলতি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পর মসিক প্রশাসনে অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

নগরের সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই। মশক নিধন কার্যত অনুপস্থিত। ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়েছে, অল্প বৃষ্টিতেই সড়ক ডুবে যায়। শহরের বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলিতে ছড়িয়ে আছে ময়লা–আবর্জনা। রাস্তার গর্তে দুর্ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। যানজট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ব্রহ্মপুত্র নদের পাশে জয়নুল আবেদিন পার্কের খোলা জায়গায় হকারদের দখল, পুকুর রক্ষায় উদাসীনতা—আগুন লাগলে অগ্নিনির্বাপণে পানির সংকট দেখা দেয়। সব মিলিয়ে ১০ লাখ নগরবাসীর জীবনযাত্রা অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
নগরবাসী নিয়মিত বিভিন্ন খাতে রাজস্ব দিচ্ছেন। এছাড়াও সদর সাবরেজিস্ট্রি অফিসের হিসাবে চলতি বছরের গত মাস পর্যন্ত দলিল রেজিস্ট্রেশন থেকে স্থানীয় সিটি কর আদায় হয়েছে ১৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।
সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন খাতে অর্থ প্রদান করেও সেবার মুখ দেখছেন না সাধারণ মানুষ। জন্ম সনদ, মৃত্যুসনদ বা অন্যান্য কাগজপত্র পেতে ঘুরতে হচ্ছে দিনের পর দিন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, লাশ গোসলের জন্য নগরে নির্দিষ্ট কোনো ঘর নেই। কবরস্থানে দাফন ও কবর খননের সময় অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়।
গত ২৩ আগস্ট থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশে প্রশিক্ষণে ছিলেন বিভাগীয় কমিশনার ও মসিক প্রশাসক মো. মোখতার আহমেদ। এ সময়ে তার অনুপস্থিতিতে প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। বিদেশ যাত্রার আগে ১১ আগস্ট তিনি ৩৩ কর্মকর্তার পদোন্নতি স্থগিত করেন। এরপর থেকে সেবামূলক কার্যক্রম কার্যত থমকে গেছে। বিভিন্ন রাস্তাঘাট ও উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে।
অভিযোগ আছে, মসিকের সচিব ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুমনা আল মজীদ সরকারি দুটি গাড়ি ও একটি রিজার্ভ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করছেন। গাড়িগুলো নিত্যদিন তার ভাড়ার বাসার নিচে থাকে, যা সন্তানদের স্কুল যাতায়াত ও ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহৃত হয়।

ময়মনসিংহ একসময় সংস্কৃতি, সাহিত্য ও শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে নাগরিক সেবার ব্যর্থতায় সেই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা দুষ্কর হয়ে উঠেছে। মহাখালী গার্লস স্কুলের অধ্যক্ষ জিয়াউদ্দিন শাকির বলেন, “স্থানীয় মানুষের চাহিদা ও নাগরিক সেবা ব্যাহত হলে কোনো প্রতিষ্ঠান কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না।”
নাগরিক সমাজ মনে করছে, দ্রুত পরিকল্পিত ও টেকসই নগর উন্নয়ন ছাড়া ময়মনসিংহ শহরকে বাসযোগ্য রাখা সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষের দাবি—অবিলম্বে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম স্বাভাবিক করা ও নগর উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন