একটি স্ট্রেচারও নেই, একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার খুঁজে পাওয়া দায়। কোনো অগ্নিকাণ্ড হলে ২০ কিলোমিটার দূর থেকে ফায়ার সার্ভিস আসতে আসতেই সব শেষ। উপজেলার অবস্থান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রশাসনিক অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থার ঘাটতিতে গুইমারা এখনো একটি “অবহেলিত সম্ভাবনার নাম।”
এভাবেই গুইমারাবাসী বর্ণনা করেছেন তাদের জীবনের প্রতিদিনের বাস্তবতা। দীর্ঘদিনের অবহেলায় স্বাস্থ্য ও অগ্নি নির্বাপনে চরম সংকটে থাকা উপজেলার জনগণ এবার রাস্তায় নেমেছে।
একটি সরকারি হাসপাতাল ও ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নির্মাণের দাবিতে শুক্রবার গুইমারা বাজার এলাকায় অনুষ্ঠিত হয় বিশাল মানববন্ধন কর্মসূচি। শত শত নারী-পুরুষ অংশ নেন কর্মসূচিতে। জনতার কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়, “আর কত প্রাণ গেলে হবে হাসপাতাল?” এবং “আর কত স্বপ্ন পুড়লে হবে ফায়ার সার্ভিস?” গুইমারার এই দাবিতে এক সুর, “স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা চাই, অবহেলা নয়।”
খাগড়াছড়ির ঐতিহ্যবাহী উপজেলা গুইমারা, ২৩৪.৫৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ অঞ্চলে প্রায় ৫৩ হাজার ২৫৮ জন মানুষ বসবাস করেন। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয়, এখনো এখানে নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি হাসপাতাল বা ফায়ার সার্ভিস স্টেশন। স্থানীয়রা জানান, কেউ হঠাৎ অসুস্থ হলে তাকে ২০–২৫ কিলোমিটার দূরের মাটিরাঙ্গা বা মানিকছড়ি হাসপাতালে নিতে হয়। এতে অনেক সময় রোগী পথেই মৃত্যুবরণ করে। রামগড় বা মাটিরাঙ্গা ফায়ার সার্ভিস থেকে গাড়ি আসতে ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। এর মধ্যেই পুড়ে ছাই হয়ে যায় মানুষের স্বপ্ন, ব্যবসা ও ঘরবাড়ি। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া গুইমারা রামসুবাজার ও জালিয়াপাড়া বাজারের ভয়াবহ অগ্নিকান্ড এই দাবির বাস্তব প্রমাণ।
বক্তারা সম্প্রতি ঘটে যাওয়া রামসুবাজার ও জালিয়াপাড়া বাজারের অগ্নিকান্ড স্মরণ করে বলেন, ফায়ার সার্ভিস পৌঁছাতে বিলম্ব করায় রামসুবাজারে প্রায় ৭৩টি দোকান ও ঘরবাড়ি ভস্মীভূত হয়েছে। একইভাবে জালিয়াপাড়ায়ও ১৯টির বেশি দোকান সম্পূর্ণ ছাই হয়ে যায়। রাত দুটোর দিকে আগুন লাগার পর ফোন দেওয়ার ৪৫ মিনিট পর ফায়ার সার্ভিস আসে। ততক্ষণে ১৯টির দোকান পুড়ে ছাই হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, গুইমারা প্রতি সপ্তাহে শত কোটি টাকার ব্যবসার কেন্দ্র, অথচ এখানে এখনো হাসপাতাল নেই। এটা সরকারের অবহেলা ছাড়া কিছুই নয়। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের সাংবিধানিক অধিকার। গুইমারা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন ডাক্তার পদায়ন থাকলেও তাকে দেখা যায় না। স্বাস্থ্যসেবার নামে গুইমারাবাসীর সঙ্গে তামাশা করা হচ্ছে। বক্তারা দাবি করেন, যতদিন পর্যন্ত উপজেলা হাসপাতাল নির্মাণ ও চালু না হবে, ততদিন ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ইসলামিক মিশনে চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। এছাড়া দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের আহ্বান জানান তারা।
বক্তারা ঘোষণা দেন, দুই মাসের মধ্যে হাসপাতাল ও ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে, গুইমারার জনগণ কঠোর আন্দোলনে নামবে। তারা গুইমারা রিজিয়ন কমান্ডার, সিন্দুকছড়ি জোন কমান্ডার, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সিভিল সার্জনের কাছে গুইমারাবাসীর দুর্ভোগ বিবেচনা করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানান।
বক্তারা গুইমারাস্থ বিজিবি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে দাবী করেন, যতদিন পর্যন্ত সরকারি হাসপাতাল না হবে, ততদিন বিজিবি হাসপাতাল যেন স্থানীয় জনগণের চিকিৎসায় সহযোগিতা করেন। আগামী সোমবার জেলা প্রশাসকের কাছে একটি স্মারকলিপি দেওয়া হবে বলে মানববন্ধন থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়।
মো. ইউছুফের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত বিশাল মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন: সাইফুল ইসলাম সোহাগ, মো. মাগফার হোসেন, মাওলানা ওসমান গণি, বাবলু হোসেন, সাংবাদিক আবদুল আলী, আবুল বাশার, মাঈন উদ্দিন বাবলু, আবু বকর, হরিপদ ত্রিপুরা, পুরোহিত স্বপন চক্রবর্তী, বিশ্ব কুমার ত্রিপুরা, আরমান হোসেন, জাহাঙ্গীর আলম, চাইলাপ্রু মারমাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। সঞ্চালনা করেন আলা উদ্দিন আরিফ।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন