খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলার রামসু বাজার এলাকার সাম্প্রতিক সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে জেলা প্রশাসনের মানবিক উদ্যোগ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে নিহত, আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত মোট ৯৭টি পরিবারের মাঝে ২৭ লাখ ৩৫ হাজার টাকার সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে গুইমারা সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামে এক আবেগঘন পরিবেশে এ সহায়তা বিতরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক এবি এম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার।
জেলা প্রশাসক উপস্থিত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন এবং সান্ত্বনা দেন।
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালীকা ত্রিপুরা।
তিনি বলেন, “এই সহায়তা কেবল অর্থ নয়, এটি রাষ্ট্রের ভালোবাসা ও সহমর্মিতার প্রতীক। আমরা চাই গুইমারার মানুষ আবারও শান্তি ও সম্প্রীতির বন্ধনে ফিরুক।”
তিনি আরও জানান, আহতদের চিকিৎসার জন্য জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আরও সহযোগিতা দেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, খাগড়াছড়ি পুলিশ সুপার আরেফিন জুয়েল, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাহীনুর রহমান, নবাগত ইউএনও মিশকাতুল তামান্না, বিদায়ী ইউএনও আইরিন আক্তার, জেলা পরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ প্রশান্ত কুমার ত্রিপুরা, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান উশ্যেপ্রু মারমা, গুইমারা থানার অফিসার ইনচার্জ এনামুল হক চৌধুরী, উপজেলা বিএনপি সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম সোহাগ, উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. রফিকুল ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সভাপতি মো. মাগফর হোসেন, গুইমারা বাজার কমিটির সভাপতি দিদারুল আলম বাবুল, এবং গুইমারা প্রেস ক্লাব সভাপতি মুহাম্মদ আবদুল আলী ও সাধারণ সম্পাদক এম দুলাল আহাম্মদসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ।
অনুষ্ঠানে নিহত তিনটি পরিবারকে প্রতি পরিবারে দুই লাখ টাকা, আহত পরিবারগুলোকে ১৫ হাজার টাকা, এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে প্রতি পরিবারে ২০ হাজার টাকা করে সহায়তা প্রদান করা হয়।
জেলা প্রশাসক এবি এম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার বলেন, “আমরা সবসময় আপনাদের পাশে আছি এবং পাশে থাকব। প্রশাসন ও সেনাবাহিনী আপনাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, এনজিও সংস্থাগুলো একযোগে কাজ করছে আপনাদের পুনর্বাসনের জন্য। কেউ যেন বিভ্রান্ত না হয়, কোনো গুজবে কান দেবেন না—একটি কুচক্রী মহল মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে চায়।” তিনি দৃঢ় কণ্ঠে আরও বলেন, “কোনো নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি করা হবে না। আপনারা নিরাপদে থাকুন, নিশ্চিন্তে যার যার কাজকর্ম করুন। তবে কোনো অপরাধী যত বড়ই হোক, তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, “আমরা চাই না, এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি হোক। প্রশাসন জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করছে, প্রতিদিন ভাবছি কীভাবে আপনাদের আরও ভালোভাবে সাহায্য করতে পারি। আমরা চাই গুইমারার মানুষ নিরাপদে ঘুমাক, শান্তিতে থাকুক। এই মাটি আমাদের, এই দেশ আমাদের—আমরা সবাই এক পরিবার।”
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, “উগ্রতা, উশৃঙ্খলতা ও বিভক্তি আমাদের সমাজে কখনোই কাম্য নয়। গুইমারা একটি সম্প্রীতির উপজেলা এখানে পাহাড়ি-বাঙালি মিলে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানই আমাদের ঐতিহ্য।” তারা আরও বলেন, “যারা সন্তান হারিয়েছেন, তাদের কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। এখন আমাদের সবার দায়িত্ব এই এলাকার শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।”
বক্তারা অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, “আপনারা সন্তানদের লেখাপড়ার দিকে মনোযোগ দিন। শিক্ষা ছাড়া উন্নতি সম্ভব নয়। শান্তি ও উন্নয়নের জন্য ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।”
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে জেলা প্রশাসক নিহত, আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের হাতে সহায়তার চেক তুলে দেন। তারা বলেন, “এ সহায়তা আমাদের আবার নতুন করে বাঁচার সাহস দিচ্ছে।”
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন