যশোরের কোল্ড স্টোরেজগুলোতে এখনো দুই লাখ মেট্রিকটন আলু অবিক্রিত রয়েছে। গত মৌসুম শেষ হতে চললেও এ অবস্থায় পড়ে আছে আলু। আলু কেনা থেকে সংরক্ষণ পর্যন্ত মোট খরচের অর্ধেক দাম, তবু ক্রেতা না থাকায় এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
অথচ চলতি নভেম্বর মাসের মধ্যে কোল্ড স্টোর থেকে আগের বছরের আলু বের করে এ মৌসুমের আলু সংরক্ষণের পরিবেশ তৈরির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কোল্ড স্টোরেজ মালিক, ব্যবসায়ী ও কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
এদিকে গত মৌসুমে কৃষক লোকসানে পড়ায় এবার আলু আবাদ ও উৎপাদন কমতে পারে এবং সামনে দাম বাড়তে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। যদিও যশোরের কৃষি বিভাগের এ বিষয়ে আশঙ্কা নেই।
কোল্ড স্টোরেজ মালিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলায় আলুর কোল্ড স্টোরেজ রয়েছে ১২টি। ধারণ ক্ষমতা ভেদে গত মৌসুমে এসব কোল্ড স্টোরেজে ৪ লাখ ১৩ হাজার ৬ শত মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল। সংরক্ষিত আলু চলতি বছরের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে হিমাগার থেকে বের করার সর্বশেষ সময় বেধে দিয়েছেন কোল্ড স্টোরেজ মালিকরা। আগের আলু বের করে কোল্ড স্টোরেজ খালি করার সময় প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। কিন্তু কোল্ড স্টোরেজগুলোতে এখনো ২ লাখ মেট্রিকটন অবিক্রিত আলু পড়ে আছে।
যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি গ্রামের কৃষক জামাল উদ্দীন বলেন, ‘গত মৌসুমে আমি কোল্ড স্টোরেজে ১০০ বস্তা আলু রেখেছিলাম। মোট খরচের অর্ধেক দামও পাইনি। কোল্ড স্টোরেজ মালিককে বলে দিয়েছি আলু বিক্রি করে তাদের খরচ বের করে নিতে। গত মৌসুমে ৩ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলাম। পুঁজি হারিয়ে লোন নিয়ে এবার আলু আবাদ করেছি দেড় বিঘা জমিতে। আমার মতো অনেকে পর্যাপ্ত আলু চাষ করতে পারছেন না। এ মৌসুমে এখনও আলু আবাদের সময় আছে। সরকারি সহযোগিতা পেলে তারা পর্যাপ্ত আলু চাষ করতে পারবেন।’
রাজু আহম্মেদ নামের একজন ব্যবসায়ী জানান, ‘প্রতি বস্তায় সাধারণত ৫৫ কেজি আলু সংরক্ষণ করা হয়। আমি যশোরের আলী কোল্ড স্টোরেজে ৫ হাজার বস্তা আলু রেখেছিলাম। মৌসুমে ১৪ টাকা কেজি দরে কেনা ছিল। বস্তা, শ্রমিক, পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ মিলে কেজি প্রতি আরও ৫ টাকা যুক্ত হয়। বস্তা প্রতি কোল্ড স্টোর ভাড়া ২৮০ টাকা। সব মিলিয়ে বস্তা প্রতি প্রায় সাড়ে ১২শ’ টাকা খরচ পড়ে। অথচ আমরা ৭০০-৭৫০ টাকার বেশি বিক্রি করতে পারিনি। এতে প্রতি বস্তায় ৫০০ টাকা লোকসান হচ্ছে।’
ব্যবসায়ী ও কোল্ড স্টোরেজ মালিকদের দেওয়া তথ্যে জানা গেছে, এ বছর সরকার নির্ধারিত প্রতি কেজি আলুর দাম ২২ টাকা। তবে মৌসুমের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত খোলা বাজারে ৫ কেজি আলু ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর কোল্ড স্টোরেজ থেকে পাইকারি বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ১৪ থেকে ১৫ টাকা দরে। তাও আশানুরুপ ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না।
যশোরের আলী কোল্ড স্টোরেজের মালিক মো. শাহনেওয়াজ বলেন, ‘আমার স্টোরেজে সংরক্ষিত আলুর ৫০ ভাগও উত্তোলিত হয়নি। মালিকরাও আলু বের করে নিচ্ছেন না। নিজে বের করে বিক্রি করবো তার উপায় নেই, কারণ দাম নেই। কিন্তু ৩০ নভেম্বরের মধ্যে স্টোর খালি করতে হবে। তার পর সেখানে অনেক কাজ। তা না করতে পারলে আগামী মৌসুম আলু রাখা যাবে না।’
যশোর বড় বাজারের আলুর আড়তদার নিউ বিসমিল্লাহ ভান্ডারের স্বত্তাধিকারী মহিউদ্দীন মহিন জানান, ‘গতবার সারাদেশে আলুর উৎপাদন বেশি হওয়ায় যোগান বেশি এবং দাম কম। তবে পুঁজি হারিয়ে অনেক কৃষক এবার আলু চাষ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। এর ফলে সামনে যোগান কমে দাম বাড়তে পারে।’
যশোরের সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা কিশোর কুমার সাহা বলেন, ‘বরাবরের মতো এবারও সরকারিভাবে বিএডিসির মাধ্যমে কৃষকদের আলু বীজ প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে।’
যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোঃ মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘গত বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আলু চাষ ও উৎপাদন বেশি হয়েছিল। এ বছর জেলার এক হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৬ হাজার মেট্রিক টন।’ তিনি আরও বলেন, ‘কৃষক যদি এবার আলু আবাদ কম করেন তাহলে সামনে দাম বাড়বে। তাই বাজার ঠিক রাখার জন্য সরকার সব ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে।’
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন