নির্বাচনী হলফনামা

নোয়াখালীতে জামায়াতের ৬ প্রার্থীর কার সম্পদ কত

নিজস্ব প্রতিবেদক, নোয়াখালী  প্রকাশিত: জানুয়ারি ১০, ২০২৬, ০২:৫৮ পিএম
নোয়াখালীতে জামায়াতের ৬ প্রার্থীর কার সম্পদ কত

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নোয়াখালীর রাজনীতিতে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। এই নির্বাচনে জেলার ৬টি আসনেই প্রার্থী দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।

সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনে প্রার্থীদের জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, বার্ষিক আয়, মামলার বিবরণ এবং নির্বাচনী ব্যয়ের এক কৌতূহলোদ্দীপক চিত্র পাওয়া গেছে। বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, জামায়াতের এই ছয় প্রার্থীর মধ্যে দুই জন কোটিপতি থাকলেও, নির্বাচনী ব্যয়ে তারা বেশ মিতব্যয়ী।

নোয়াখালীর ছয়টি আসনে জামায়াতের হয়ে লড়ছেন অভিজ্ঞ ও শিক্ষিত একঝাঁক নেতা। তারা হলেন-

  • নোয়াখালী-১ (চাটখিল ও সোনাইমুড়ী আংশিক): মো. ছাইফ উল্লাহ (চাটখিল উপজেলা আমির)।
  • নোয়াখালী-২ (সেনবাগ ও সোনাইমুড়ী আংশিক): মো. সাইয়েদ আহমদ (জেলা নায়েবে আমির)।
  • নোয়াখালী-৩ (বেগমগঞ্জ): মো. বোরহান উদ্দিন (জেলা সেক্রেটারি)।
  • নোয়াখালী-৪ (সদর ও সুবর্ণচর): ইসহাক খন্দকার (জেলা আমির)।
  • নোয়াখালী-৫ (কোম্পানীগঞ্জ ও কবিরহাট): মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন (কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আমির)।
  • নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া): অ্যাডভোকেট শাহ মোহাম্মদ মাহফুজুল হক (সাবেক ঢাবি শিবির সভাপতি)।

পেশাগত দিক থেকে এই ছয় প্রার্থীর মধ্যে ৩ জন শিক্ষক, ২ জন ব্যবসায়ী এবং ১ জন আইনজীবী।

হলফনামার তথ্যমতে, জেলার ছয় প্রার্থীর মধ্যে মো. ছাইফ উল্লাহ এবং ইসহাক খন্দকার এই দুই জন কোটিপতি। বাকিরা সম্পদের হিসেবে লাখোপতি।

  • মো. ছাইফ উল্লাহ: তার স্থাবর সম্পত্তির আনুমানিক মূল্য ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। এছাড়া ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে।
  • ইসহাক খন্দকার: সম্পদের দৌড়ে তিনি সবার চেয়ে এগিয়ে। তার স্থাবর সম্পদের মূল্য ১ কোটি ৩৯ লাখ ২৫ হাজার ১২৮ টাকা। তার অস্থাবর সম্পদ আছে ৮২ লাখ ৩০ হাজার ৯৩৮ টাকার। মজার বিষয় হলো, তার স্ত্রীর নামে ২০ ভরি স্বর্ণ (মূল্য ৪০ লাখ টাকা) রয়েছে।
  • বোরহান উদ্দিন: তার মোট অস্থাবর সম্পদ ৪২ লাখ টাকা এবং স্থাবর সম্পদ ১৪ লাখ ৯১ হাজার ৩৫০ টাকা।
  • অ্যাডভোকেট মাহফুজুল হক: তার নিজের নামে ৬ লাখ ৭৯ হাজার টাকা এবং স্ত্রীর নামে ১০ লাখ ৮০ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পদ আছে।

অন্যদিকে, সাইয়েদ আহমদ ও মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেনের ব্যক্তিগত বা স্ত্রীর নামে বড় কোনো একক স্থাবর সম্পত্তি নেই। তবে বেলায়েত হোসেনের যৌথ মালিকানায় ১৫ লাখ টাকা মূল্যের জমি রয়েছে। প্রার্থীদের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, ব্যবসা, শিক্ষকতা ও সঞ্চয়।

  • সর্বোচ্চ নগদ টাকা: নোয়াখালী-৫ আসনের বেলায়েত হোসেনের কাছে সবচেয়ে বেশি নগদ টাকা আছে (২০ লাখ ১৪ হাজার ১৪৪ টাকা)।
  • সর্বনিম্ন নগদ টাকা: জেলা আমির ইসহাক খন্দকারের হাতে নগদ আছে মাত্র ৩৬ হাজার ৭৭০ টাকা।
  • বার্ষিক আয়ের উৎস শিক্ষকতা: ছাইফ উল্লাহ শিক্ষকতা থেকে বছরে ৬ লাখ ৬ হাজার টাকা এবং বাড়ি ভাড়া ও সঞ্চয় থেকে প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা আয় করেন।
  • আইন পেশা: শাহ মোহাম্মদ মাহফুজুল হক আইন পেশা থেকে বছরে ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা আয় করেন।
  • কৃষি ও ব্যবসা: বোরহান উদ্দিন এবং ইসহাক খন্দকার কৃষি ও ব্যবসা উভয় খাত থেকেই আয় করেন। তবে সাইয়েদ আহমদের আয়ের চেয়ে তার ওপর নির্ভরশীলদের ব্যবসায়িক আয় (৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা) বেশি।

নির্বাচনী ব্যয়ের ক্ষেত্রে এক ব্যতিক্রমী তথ্য পাওয়া গেছে। জেলা আমির ইসহাক খন্দকার কোটিপতি হওয়া সত্ত্বেও অন্য পাঁচ প্রার্থীর তুলনায় সবচেয়ে কম খরচ করবেন। তার নির্বাচনী বাজেট মাত্র ১৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৫ লাখ টাকা তার নিজের জমানো, আর বাকি টাকা আসবে তার ছেলে ও জামাতার অনুদান থেকে।

বিপরীতে, সবচেয়ে বেশি ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন বোরহান উদ্দিন। তিনি ৪৫ লাখ টাকা খরচ করার কথা হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। এই বিশাল অঙ্কের টাকার বড় একটি অংশ আসবে তার প্রবাসী স্বজন এবং শুভানুধ্যায়ীদের অনুদান থেকে। এটি স্পষ্ট যে, জামায়াত প্রার্থীরা নিজেদের উপার্জিত অর্থের চেয়ে আত্মীয়-স্বজন ও দলীয় শুভাকাঙ্ক্ষীদের সাহায্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল।

রাজনীতিতে মামলার বিষয়টি নিয়মিত হলেও নোয়াখালীর এই ছয় প্রার্থীর মধ্যে দুই জনের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই।

  • সবচেয়ে বেশি মামলা: মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেনের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ৩টি মামলা রয়েছে।
  • অন্যান্য: ইসহাক খন্দকার ও সাইয়েদ আহমদের বিরুদ্ধে ২টি করে এবং বোরহান উদ্দিনের বিরুদ্ধে ১টি মামলা রয়েছে।
  • মামলাহীন: মো. ছাইফ উল্লাহ এবং শাহ মোহাম্মদ মাহফুজুল হকের বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনো মামলা নেই।

২০০৮ সাল থেকে হলফনামা বাধ্যতামূলক করার মূল উদ্দেশ্য ছিল ভোটারদের কাছে প্রার্থীদের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি তুলে ধরা। নোয়াখালীর এই প্রার্থীরা শিক্ষকতা, আইন বা ব্যবসার মতো সম্মানজনক পেশার সাথে জড়িত। কোটিপতি হওয়া সত্ত্বেও তাদের নির্বাচনী বাজেটে আড়ম্বরতার চেয়ে আত্মীয়দের ওপর নির্ভরতা এবং পরিমিত বোধ লক্ষ্য করা গেছে। এখন দেখার বিষয়, এই তথ্যগুলো ভোটারদের সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলে।

এএন/জেএইচআর