এক্সপ্রেসওয়ের ঢালে নিথর দেহ: কৃষিবিদের রহস্যজনক মৃত্যু, একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ

পটুয়াখালী ও মাদারীপুর প্রতিনিধি প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৫, ২০২৬, ১১:৩৭ পিএম
এক্সপ্রেসওয়ের ঢালে নিথর দেহ: কৃষিবিদের রহস্যজনক মৃত্যু, একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ

কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকাল। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর ইউনিয়নের সেরাজপুর গ্রাম। অন্য সময় ধানের ক্ষেত আর পাখির কলকাকলিতে মুখর থাকে যে গ্রাম, আজ সেখানে কেবলই কান্নার রোল। গ্রামের বাতাস ভারী হয়ে আছে শোকের মাতমে। এই গ্রামেরই কৃতি সন্তান, কৃষিবিদ শহিদুল ইসলাম (৪২) ফিরেছেন ঠিকই, তবে জীবিত নয়, কাফনে মোড়ানো নিথর দেহ হয়ে। মাত্র তিন দিন আগেও যিনি ছিলেন কর্মচঞ্চল, দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে বিভোর এক বাবা, আজ তিনি শুধুই স্মৃতি। 

গত শুক্রবার মাদারীপুরের শিবচরে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের পাশ থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। আর আজ রোববার বেলা ১১টায় জানাজা শেষে তাকে শায়িত করা হলো পারিবারিক কবরস্থানে। মাটি চাপা দিয়ে সবাই যখন ঘরে ফিরল, তখনো শহিদুলের স্ত্রী শাম্মী আকতারের বিলাপ থামেনি। দুই এতিম সন্তানকে বুকে জড়িয়ে তিনি শুধুই বলছেন, আমার সন্তানেরা এতিম হয়ে গেছে, আর আমিও স্বামীহারা হয়ে গেলাম।

ঘটনার সূত্রপাত গত বুধবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৬। কৃষিবিদ শহিদুল ইসলাম কর্মরত ছিলেন আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম গবেষণা কেন্দ্রের (সিআইএমএমওয়াইটি) গবেষণা উন্নয়ন সহকারী হিসেবে। পোস্টিং ছিল বরিশালের আলেকান্দা এলাকায়। পেশাগত প্রয়োজনে এবং ব্যক্তিগত কিছু আর্থিক লেনদেনের কাজে তিনি ঢাকায় গিয়েছিলেন। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, বুধবার সকালে তিনি ঢাকার গুলশান অ্যাভিনিউতে অবস্থিত স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের শাখায় যান। সেখানে একটি পে অর্ডারের কাজ ছিল তার। কাজ শেষ করে দুপুরের দিকে তিনি বরিশালের উদ্দেশে রওনা দেন।

স্ত্রী শাম্মী আকতারের সঙ্গে শেষবার যখন কথা হয়, তখনো সব স্বাভাবিক ছিল। শহিদুল জানিয়েছিলেন, তিনি বাড়ির পথ ধরেছেন। কিন্তু দুপুরের পর থেকেই তার মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। প্রথমে পরিবার ভেবেছিল হয়তো বাসে নেটওয়ার্কের সমস্যা বা ফোনের চার্জ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামলেও শহিদুলের ফোন সচল হয়নি। তিনি বাড়িও ফেরেননি। উদ্বেগ বাড়তে থাকে পরিবারের। আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব এবং সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ নিয়েও তার কোনো সন্ধান মেলেনি। উদ্বেগ যখন আতঙ্কে রূপ নেয়, তখন ওই দিনই বুধবার শহিদুলের শ্বশুর আবু সালেহ উদ্দিন আহম্মেদ ঢাকার গুলশান থানায় অনলাইনে একটি সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করেন। কিন্তু প্রযুক্তির এই যুগেও টানা দুই দিন নিখোঁজ থাকার পর মিলল কেবল তার লাশ।

শুক্রবার ২৩ জানুয়ারি বিকেল। মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলা। দেশের অন্যতম ব্যস্ত মহাসড়ক ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে তখন শত শত গাড়ি ছুটছে। সূর্যনগর আন্ডারপাসের উত্তর পাশে রাস্তার ঢালে পথচারীরা একটি লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। খবর যায় শিবচর উপজেলার দত্তপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশটি উদ্ধার করে। প্রথমে পরিচয় পাওয়া যাচ্ছিল না। লাশের পরনে ছিল ভদ্রোচিত পোশাক, পাশে পড়ে ছিল এক জোড়া জুতা এবং একটি কালো চশমা। পকেটে পাওয়া যায় নগদ ২ হাজার ৯০০ টাকা। কিন্তু শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। 

মনে হচ্ছিল, কেউ যেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে শুয়ে আছে ঘাসের ওপর। পুলিশের তদন্ত দল সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর প্রযুক্তির সহায়তায় এবং পকেটে থাকা কাগজপত্রের সূত্র ধরে মৃত ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করে। জানা যায়, এই অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিই দুই দিন ধরে নিখোঁজ থাকা কৃষিবিদ শহিদুল ইসলাম।

লাশ উদ্ধারের খবর যখন বরিশালে শহিদুলের স্ত্রী শাম্মী আকতারের কাছে পৌঁছায়, তখন আকাশ ভেঙে পড়ে তার মাথায়। তিনি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে তার স্বামী আর নেই। আজ রোববার লাশ দাফনের পর শোকে পাথর হয়ে যাওয়া শাম্মী আকতার গণমাধ্যমের সামনে কিছু প্রশ্ন তুলে ধরেন, যা এই মৃত্যুকে ঘিরে রহস্যের জন্ম দিয়েছে। শাম্মী আকতার বলেন, তিনি শহিদুল অত্যন্ত সচেতন এবং বুদ্ধিমান মানুষ ছিলেন। যাত্রাপথে অপরিচিত কারো দেওয়া খাবার খাওয়ার মতো মানুষ তিনি নন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তিনি কোনো সাধারণ দুর্ঘটনার শিকার হননি। তাকে হয়তো জোর করে বা কৌশলে কিছু খাওয়ানো হয়েছে। 

পরিবারের প্রধান সন্দেহ অজ্ঞান পার্টি বা মলম পার্টির দিকে। মহাসড়কে বাসে বা পরিবহনে যাত্রীদের চেতনানাশক খাইয়ে সর্বস্ব লুটে নেওয়ার ঘটনা নতুন নয়। শাম্মী আকতারের ধারণা, তার স্বামীকেও হয়তো টার্গেট করেছিল কোনো চক্র। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, হয়তো মলম বা অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়ে তার এমন মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু তারা কেন তাকে মেরে ফেলল? আমি চাই, আমার স্বামী কেন ও কীভাবে মারা গেল, সেই রহস্য উন্মোচিত হোক। আমি বিচার চাই।

শহিদুল ইসলামের অকাল মৃত্যুতে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে তার দুই শিশুপুত্র। বড় ছেলে সাইফান আবদুল্লাহর বয়স মাত্র ১০ বছর। সে বরিশাল শহরের জাহানারা ইসরাইল স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। বাবার মৃত্যুটা সে কিছুটা বুঝতে পারছে, তার চোখের জল বাঁধ মানছে না। কিন্তু ছোট ছেলে সাদমান সাফিন? তার বয়স মাত্র ৩ বছর। বাবার কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল, বুঝতেই পারছিল না যে তার বাবা তাকে আর কোনোদিন কোলে তুলে নেবে না। শাম্মী আকতার এখন দুই ছেলেকে নিয়ে অথৈ সাগরে। 

কৃষিবিদ স্বামীর উপার্জনেই চলত সংসার, চলত সন্তানদের পড়াশোনা। হঠাৎ করে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এই পরিবারটি এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। শাম্মী আকতারের আর্তনাদ, আমার ছেলেরা এতিম হয়ে গেল, উপস্থিত প্রতিবেশী এবং আত্মীয় স্বজনদের চোখেও জল এনে দেয়।

লাশ উদ্ধারের পর মাদারীপুর জেলা হাসপাতালে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত করেনি পুলিশ। দত্তপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের উপপরিদর্শক বা এসআই ইজারত হোসেন জানান, আমরা খবর পেয়ে শুক্রবার বিকেলে লাশটি উদ্ধার করি। সুরতহাল প্রতিবেদনে শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। পকেটে নগদ ২ হাজার ৯০০ টাকা অক্ষত ছিল। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এলেই মৃত্যুর আসল কারণ জানা যাবে। এখানেই দানা বাঁধছে রহস্য। যদি অজ্ঞান পার্টি বা ছিনতাইকারী চক্রের কাজই হবে, তবে পকেটের টাকা কেন রেখে গেল তারা? সাধারণত এ ধরনের চক্র যাত্রীদের সবকিছু লুটে নিয়ে যায়। তবে কি পে অর্ডারের বড় কোনো টাকা বা অন্য কোনো মূল্যবান জিনিস তার সঙ্গে ছিল, যা খোয়া গেছে? নাকি দুর্বৃত্তরা তাড়াহুড়ো করে পালানোর সময় পকেটের টাকা নিতে পারেনি? 

শিবচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, লাশটি কীভাবে ও কারা রাস্তার ঢালে ফেলে গেল, তা নিয়ে আমরা তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি। সিসিটিভি ফুটেজ বা প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হতে পারে। আজ রোববার শহিদুলের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় মামলা করার কথা রয়েছে। আমরা পরিবারটিকে সব ধরনের আইনি সহায়তা দেব। ঘটনাটি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করছি।

কৃষিবিদ শহিদুল ইসলামের মৃত্যু আবারও দেশের মহাসড়কগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে দেশের অন্যতম আধুনিক মহাসড়ক হলেও, যাত্রীবাহী বাসগুলোর ভেতরে কী ঘটছে, তা মনিটরিং করার ব্যবস্থা অপ্রতুল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অজ্ঞান পার্টি বা মলম পার্টির সদস্যরা এখন অনেক বেশি কৌশলী। তারা যাত্রীর ছদ্মবেশে পাশে বসে, সখ্যতা গড়ে তোলে এবং কৌশলে বিষাক্ত খাবার বা পানীয় খাইয়ে দেয়। অনেক সময় চেতনানাশকের মাত্রা বেশি হলে ভুক্তভোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হয়। 

শহিদুলের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত চেতনানাশকের প্রয়োগে হার্ট অ্যাটাক বা শ্বাসকষ্টে মৃত্যু হয়েছে কি না, তা ময়নাতদন্তেই বেরিয়ে আসবে। তবে পরিবারের দাবি, যদি এটি হত্যাকাণ্ড হয়, তবে অপরাধীদের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়। আর যদি এটি অজ্ঞান পার্টির কাজ হয়, তবে প্রশাসনের উচিত মহাসড়কে যাত্রী নিরাপত্তায় আরও কঠোর হওয়া।

রোববার বেলা ১১টায় জানাজা শেষে শহিদুল ইসলামকে যখন কবরে নামানো হয়, তখন সেরাজপুর গ্রামে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। যে মানুষটি দেশের কৃষি উন্নয়নে ভূমিকা রাখছিলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করে দেশের সুনাম বাড়াচ্ছিলেন, তার এমন অপমৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না কেউই। সহকর্মী ও বন্ধুরা তাকে একজন সজ্জন, পরোপকারী এবং মেধাবী কৃষিবিদ হিসেবে স্মরণ করছেন। আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম গবেষণা কেন্দ্রের সহকর্মীরাও এই ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন। 

জানাজা শেষে সবাই চলে গেলেও কবরের পাশে ঠাঁই দাঁড়িয়ে ছিলেন শহিদুলের বৃদ্ধ বাবা মা আর স্বজনেরা। আর দূরে ঘরের কোণে দুই এতিম সন্তানকে বুকে জড়িয়ে বিলাপ করছিলেন শাম্মী আকতার। তার সেই কান্নার শব্দ যেন ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের ওই নির্জন ঢালে পড়ে থাকা মানবতার পরাজয়েরই প্রতিধ্বনি। পরিবার এখন ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়। প্রশাসনের কাছে তাদের একটাই দাবি, এই রহস্যজনক মৃত্যুর জট দ্রুত খোলা হোক।