রংপুর সিটি কর্পোরেশন

খাস টোলের নামে ১ কোটি ১৯ লাখ টাকা ভাগ-বাটোয়ারার অভিযোগ

শরিফুল ইসলাম, রংপুর প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৬, ২০২৬, ০৪:০৩ পিএম
খাস টোলের নামে ১ কোটি ১৯ লাখ টাকা ভাগ-বাটোয়ারার অভিযোগ

রংপুর সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন হাট-বাজারে ইজারাদারদের দৌরাত্ম্য, অতিরিক্ত টোল আদায় এবং খাস টোল বা খাজনা আদায়ে অনিয়মের কারণে সাধারণ বিক্রেতা ও ক্রেতারা তীব্র হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সরকারি নির্দেশিকা (টোল তালিকা) না মেনে ইচ্ছামতো অর্থ আদায় এবং ইজারার বাইরে এসেও জোরপূর্বক টোল আদায়ের ঘটনা অহরহ ঘটছে, যা নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।

অন্যদিকে সিটি কর্পোরেশনের ৮ টি হাট-বাজার ইজারা না দিয়ে নিজেরাই খাস টোল আদায়ের নামে সিন্ডিকেটের সাথে ১ কোটি ১৯ লাখ ৩১ হাজার ১১৪ টাকা ভাগ-বাটোয়ারার অভিযোগ উঠেছে।

খাস টোল আদায়ে সিটি কর্পোরেশন ও সরকার যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে ক্রেতা ও বিক্রেতারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। 

রংপুর সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন বিভিন্ন বাজার ও হাটগুলো ঘুরে দেখা যায় অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাস্বার্থিতা ও সাধারণ ক্রেতা-বিক্রেতার সাথে জুলুম করার দৃশ্য। এই টোল নিয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে প্রতিনিয়ত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়।

সূত্রে জানা যায়, রংপুর সিটি কর্পোরেশন শুরু হওয়ার পর থেকে কম-বেশি ১৬ টি হাট-বাজার ইজারা দিয়ে থাকে সিটি কর্পোরেশন। এর মধ্যে কিছু হাট-বাজার টেন্ডার, কিছু গোপনীয়তা ভিত্তিক, আবার কিছু হাট-বাজার সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ নিজেরাই খাস টোল আদায় করে থাকেন।

বাংলা ১৪৩২ সালে রংপুর সিটি কর্পোরেশন বুড়ির হাট ইজারাদার ফরহাদ হোসেনকে সর্বোচ্চ ৩ কোটি ১১ লাখ টাকা (ভ্যাট, আয়কর ও জামানতসহ মোট ৪ কোটি ৪ লাখ ৩০ হাজার), সিটি বাজার ইজারাদার শাহ জামাল বাপ্পিকে সর্বোচ্চ ৭৪ লাখ ৫ হাজার টাকা (ভ্যাট, আয়কর ও জামানতসহ মোট ৯৬ লাখ ৩৯ হাজার ৫০০), নজিরের হাট ইজারাদার জহিরুল কবির মুকুলকে সর্বোচ্চ ৪ লাখ ৪৫ হাজার টাকা (ভ্যাট, আয়কর ও জামানতসহ মোট ৬ লাখ ৪ হাজার ৫০০), শ্রী সীতানাথ বণিক বিতানি ইজারাদার মহিদুল ইসলাম শেখ হিরাকে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ১১ হাজার টাকা (ভ্যাট, আয়কর ও জামানতসহ মোট ৪ কোটি ৪ লাখ ৩০০), মাহিগঞ্জ পাইকারি বাজার ইজারাদার মোহাম্মদ আরমান পাটোয়ারীকে সর্বোচ্চ ১১ লাখ টাকা (ভ্যাট, আয়কর ও জামানতসহ মোট ১৪ লাখ ৩০ হাজার), নিশবেতগঞ্জ হাট মেহেদী হোসেনকে সর্বোচ্চ ১১ লাখ ১১ হাজার ৯৯৫ টাকা (ভ্যাট, আয়কর ও জামানতসহ মোট ১৪ লাখ ৪৫ হাজার ৫৯৪), সাহেবগঞ্জ হাট ইজারাদার নূর মোহাম্মদ আতিকুলকে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬১ হাজার ৯৯৯ টাকা (ভ্যাট, আয়কর ও জামানতসহ মোট ২ লাখ ৯ হাজার ৫০৯) এবং চকইসবপুর হাট ইজারাদার মেরাজুলকে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা (ভ্যাট, আয়কর ও জামানতসহ মোট ২৬ হাজার) ইজারা প্রদান করে। যা থেকে সিটি কর্পোরেশন ইজারা পেয়েছে ৪ কোটি ১৬ লাখ ৮৪ হাজার ১৯৪ টাকা। 

সরকার ভ্যাট পেয়েছে ৬২ লাখ ৫২ হাজার ৬২৯ টাকা, আয়কর এসেছে ৪১ লাখ ৬৮ হাজার ৪২০ টাকা এবং জামানত ২০ লাখ ৮৪ হাজার ২২০ টাকা।

অন্যদিকে সিটি কর্পোরেশন ৮ টি হাট খাস টোলের নামে লালবাগ হাট থেকে আদায় দেখিয়েছে ৯২ লাখ টাকা। যা গত বছরের ইজারা মূল্যের চাইতে ১ কোটি ২ লাখ ৭৩ হাজার ৭৯৫ টাকা কম। তেমনি উত্তম হাজীরাহাট থেকে আদায় দেখিয়েছে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৬০ টাকা, যা গত বছরের চেয়ে ৮ লাখ ৬৪ হাজার ৪৮ টাকা কম। কেল্লাবন্দ সিও বাজার থেকে আদায় দেখিয়েছে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৩৫০ টাকা, যা গত বছরের চেয়ে ২ লাখ ৯২ হাজার ৭২৭ টাকা কম। চওড়ারহাট থেকে ১ লাখ ২৮ হাজার ৬৮৫ টাকা আদায় দেখানো হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে ২ লাখ ৭৩ হাজার ৭৯৫ টাকা কম। ধাপ বাজার থেকে ৪১ হাজার ৩৫০ টাকা আদায় দেখানো হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৫০২ টাকা কম। কেরানীরহাট থেকে ২৮ হাজার ৭৫৫ টাকা আদায় দেখানো হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে ৩৬ হাজার ৬৪৪ টাকা কম। গোলাগঞ্জ কেরানীরহাট থেকে ২২ হাজার ১৭৫ টাকা আদায় দেখানো হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে ৩৩ হাজার ৪০৩ টাকা কম। চান্দকুটি হাট থেকে ১৫ হাজার ২৪৭ টাকা আদায় দেখানো হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে ৪ হাজার ২০০ টাকা কম। গত বছরের তুলনায় এই ৮ টি হাট থেকে সিটি কর্পোরেশন খাস টোলের নামে ১ কোটি ১৯ লাখ ৩১ হাজার ১১৪ টাকা কম আদায় দেখিয়ে সিন্ডিকেট ও নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগির অভিযোগ উঠেছে।

২০২৩ সালের সরকারি বিধি উপেক্ষা করে প্রতিটি টোল আদায় ব্যবস্থায় দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করা হয়েছে। হাট-বাজারগুলোতে টোল আদায়ের মূল্য তালিকা বা চার্ট টাঙানোর নির্দেশনা থাকলেও কোথাও এমন দৃশ্য দেখা যায়নি। যার যেভাবে মনে হচ্ছে ইচ্ছামতো টোল আদায় করছে। 

রংপুরের বাস টার্মিনাল এলাকায় মৎস্য আড়তে একই মাছে একই হাটে টোল আদায় করা হয় তিনবার। সরকারি বিধি মোতাবেক শুধুমাত্র বিক্রেতার কাছ থেকে টোল আদায়ের নিয়ম থাকলেও তা না মেনে ক্রেতা ও বিক্রেতার কাছ থেকে জুলুম করে টোল আদায় করা হচ্ছে।

টার্মিনাল সংলগ্ন মৎস্য আড়তের ইজারাদার জোবায়দুল ইসলাম এবারে হাটটি ৩১ লাখ টাকায় ইজারা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তিনিও মানছেন না কোনো নিয়ম-নীতি। এক মাছ থেকে তিনবার টোল আদায় করায় ক্ষোভের দানা বেঁধেছে ব্যবসায়ী ও ক্রেতার মধ্যে। এমনকি নিজের খাবারের জন্য এক কেজি মাছ ক্রয় করলেও দিতে হচ্ছে চাঁদা।

শুধু ইজারাদাররাই নয়, সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ নিজেরাই খাস আদায় করেন রংপুর লালবাগ হাটে। সেখানে কাফি নামের পূর্বের ইজারাদারকে মৌখিকভাবে আদায়ের দায়িত্ব প্রদান করে কর্তৃপক্ষ। তিনি কর্মকর্তাদের নিয়ে দুর্নীতির মহোৎসবে মেতে উঠেছেন। লালবাগ হাটে পুরাতন সাইকেল কেনাবেচায় ক্রেতার কাছে ২৫০ টাকা এবং বিক্রেতার কাছে ১০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে, তবে রশিদ দেওয়া হয় শুধু বিক্রেতাকে। তেমনি একটি ছাগলে ক্রেতাকে ২০০ টাকা এবং বিক্রেতাকে ১০০ টাকা দিতে হয়। 

গরুর ক্ষেত্রে ক্রেতাকে ৬০০ টাকা এবং বিক্রেতাকে ২৫০ টাকা দিতে হয়। সিটি কর্পোরেশনের হাটগুলো থেকে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা আদায় করা হলেও বাস্তবে জমা পড়ছে নামমাত্র অর্থ। একই চিত্র দেখা যায় বুড়িরহাট, সিটি বাজার ও স্টেশন বাজারসহ প্রতিটি হাটে।

অনিয়মের বিষয়ে রংপুর সিটি কর্পোরেশনের হাট-বাজার শাখার রাজস্ব কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন, কিছুটা অনিয়মভাবে ইজারাদাররা টোল আদায় করে থাকেন। ইজারা গ্রহণের পরে তারা আর আমাদের কথা মানতে চান না।

এদিকে সিটি কর্পোরেশনের সদ্য যোগদান করা প্রশাসক মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের অনিয়মের কথা আমার জানা নেই। অভিযোগ খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ইএইচ