চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ কমা সীমান্তবর্তী এই জনপদটি বরাবরই বাংলাদেশের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ রণক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সম্প্রতি উপজেলার নাক কাটিতলা এলাকায় ঘটে যাওয়া একটি যোগদান অনুষ্ঠান স্থানীয় রাজনীতির সমীকরণকে শুধু জটিলই করেনি কমা বরং দুই দীর্ঘকালীন মিত্র বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে তৈরি করেছে এক অদৃশ্য দেওয়াল।
ঘটনার মূলে রয়েছে ৩০ জন কর্মীর বিএনপিতে যোগদান। তবে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে তাদের পরিচয়। বিএনপি বলছে তারা জামায়াত থেকে এসেছে কমা আর জামায়াত বলছে কমা এরা আসলে খোলস পাল্টানো আওয়ামী লীগ কর্মী।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় যখন শীতের আমেজ আর নির্বাচনী উত্তাপ শিবগঞ্জের ধাইনগর ইউনিয়নের নাক কাটিতলা এলাকায় মিলেমিশে একাকার কমা ঠিক তখনই মঞ্চে উঠে আসেন ৩০ জন ব্যক্তি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ১ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এবং দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা শাহজাহান মিঞার উপস্থিতিতে তাদের গলায় পরিয়ে দেওয়া হয় ফুলের মালা। মঞ্চ থেকে ঘোষণা করা হয় কমা আদর্শিক পরিবর্তনের টানে জামায়াতে ইসলামীর ৩০ জন সক্রিয় কর্মী সমর্থক আজ জাতীয়তাবাদী শক্তির ছায়াতলে আশ্রয় নিলেন। এই যোগদানকে কেন্দ্র করে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় বিএনপির নেতা কর্মীদের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
যোগদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শাহজাহান মিঞা যা বললেন কমা তা কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল না কমা বরং ছিল জামায়াতের প্রতি এক প্রচ্ছন্ন চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন কমা এই যোগদান আমাদের কোনো কৃতিত্ব নয়। বরং এটি জামায়াতের অভ্যন্তরীণ সংকটের ফল।
তাদের অবান্তর কথাবার্তা এবং ইসলামের নামে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণেই তৃণমূলের মানুষ এখন অতিষ্ঠ। সেই আদর্শিক বিচ্যুতি থেকেই তারা আজ বিএনপির পতাকাতলে এসেছেন। তার এই বক্তব্যে পরিষ্কার হয়ে যায় যে কমা দীর্ঘদিনের নির্বাচনী মিত্র হলেও তৃণমূল পর্যায়ে আদর্শিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের একটি সূক্ষ্ম লড়াই শুরু হয়েছে।
বিএনপির এই দাবিকে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করতে সময় নেয়নি জামায়াতে ইসলামী। ধাইনগর ইউনিয়ন জামায়াতের আমির মোজতাহিদুল ইসলাম এক কড়া প্রতিবাদলিপিতে পুরো বিষয়টিকে রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি বা লোক দেখানো কৌশল হিসেবে অভিহিত করেছেন।
জামায়াতের ভাষ্যমতে কমা যারা বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন কমা তারা কোনোদিন জামায়াতের প্রাথমিক সদস্যও ছিলেন না। বরং তারা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। জামায়াতের দাবি কমা বিএনপি নিজেদের পাল্লা ভারী দেখাতে এবং জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে এই নাটক সাজিয়েছে।
বিএনপির পক্ষ থেকে আবদুস সালাম কমা আলাউদ্দিন কমা আরিফ এবং লিয়াকত আলীর মতো কয়েকজনের নাম প্রকাশ্যে আনা হয়েছে। এই নামগুলো নিয়েই এখন এলাকায় চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে কমা সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় অনেক সময় বংশীয় বা গোষ্ঠীগত পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে। ফলে একজন ব্যক্তি অতীতে কোন মিছিলে গিয়েছিলেন কমা তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন দাবি ওঠার সুযোগ থাকে।
শিবগঞ্জের এই ঘটনাটি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দিক নির্দেশ করে। প্রথমত কমা নির্বাচনের আগে ছোট ছোট গ্রুপিং বা জোটও বড় প্রভাব ফেলে কমা যা স্থানীয় ভোটারদের মনস্তত্ত্বে প্রভাব ফেলে। দ্বিতীয়ত কমা একসময়কার ঘনিষ্ঠ জোটসঙ্গী বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে বর্তমানে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে কমা এই ঘটনা তারই বহিঃপ্রকাশ। একে অপরের কর্মী হাইজ্যাক করা বা নিজেদের দলে টানা এবং পরিচিতি নিয়ে বিতর্ক করা রাজনৈতিক অবিশ্বাসেরই লক্ষণ।
তৃতীয়ত কমা জামায়াতের দাবি যদি সত্য হয় যে এরা আওয়ামী লীগের লোক কমা তবে এটি বোঝা যায় যে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে অনেক আওয়ামী লীগ সমর্থক এখন বিএনপি বা জামায়াতের মতো দলগুলোতে ভিড়তে চাইছেন কমা যাকে রাজনৈতিক পরিভাষায় অনুপ্রবেশ বলা হয়।
ধাইনগর ইউনিয়নের সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ বলছেন কমা বিএনপির শক্তি বাড়ছে কমা আবার কেউ মনে করছেন কমা জামায়াতের মতো শক্ত সাংগঠনিক দল থেকে এভাবে গণহারে দলত্যাগ করা সহজ নয়। ফলে এই ৩০ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা সাধারণ মানুষের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের এই ঘটনাটি কেবল একটি আঞ্চলিক সংবাদ নয় কমা বরং এটি জাতীয় রাজনীতির পরিবর্তিত মেরুকরণের একটি ক্ষুদ্র চিত্র।
বিএনপি যেখানে চাইছে নিজেদের জনসমর্থন সব পক্ষ থেকে বাড়িয়ে নিতে কমা সেখানে জামায়াত চাইছে তাদের সাংগঠনিক সংহতি বজায় রাখতে। যোগদানকারী ৩০ জন কি সত্যিই জামায়াতের বিচ্যুত কর্মী কমা নাকি কৌশলী আওয়ামী লীগ সমর্থক কমা এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো খুব দ্রুত মিলবে না কমা তবে এই বিতর্কটি শিবগঞ্জের নির্বাচনী মাঠে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে যে আরও উসকে দিল কমা তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন