২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টের ছাত্র জনতার আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। রংপুরে আবু সাঈদের আত্মত্যাগের সেই কালজয়ী দৃশ্য আমাদের সবার স্মৃতিতে অম্লান। কিন্তু একই দিন অর্থাৎ ১৬ জুলাই বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও ঝরেছিল তিনটি তাজা প্রাণ।
তাঁরা হলেন ফয়সাল আহমেদ শান্ত, ওয়াসিম আকরাম ও মো. ফারুক। রংপুরের ঘটনায় পুলিশের দায় স্পষ্ট থাকলেও চট্টগ্রামের মুরাদপুর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় হামলা এবং গুলির ঘটনায় মূল অভিযুক্ত ছিলেন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের সশস্ত্র কর্মীরা।
তবে ঘটনার দুই বছর পর প্রশ্ন উঠেছে যে তদন্তের মোড় কি সঠিক পথে আছে, নাকি বিচার প্রক্রিয়ার আড়ালে চলছে পুরোনো কোনো স্থানীয় শত্রুতার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি? ২০২৪ সালের ২২ জুলাই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম নেত্র নিউজ চট্টগ্রামের সেই রক্তক্ষয়ী সংঘাত নিয়ে একটি ভিডিও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
সেখানে দেখা যায় একদল সশস্ত্র যুবক প্রকাশ্য দিবালোকে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষণ করছে। অনুসন্ধানে তাদের পরিচয় পাওয়া যায় যে তারা সবাই চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী বলয়ের অনুসারী।
নেত্র নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী এই শুটার বা বন্দুকধারীরা মূলত হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর এবং নুরুল আজিম রনির ঘনিষ্ঠ সহযোগী। আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো বাবর ও রনি দুজনেই তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের একান্ত আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। নওফেলের সংসদীয় আসনেই এই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটেছিল।
শতাধিক ছবি ও ভিডিও প্রমাণ ইঙ্গিত দেয় যে এই সশস্ত্র প্রতিরোধের পেছনে নওফেলপন্থী ছাত্রলীগের একটি শক্ত নেটওয়ার্ক বা শক্তিশালী যোগাযোগ মাধ্যম কাজ করেছিল।
ফজলে করিম চৌধুরী ছিলেন চট্টগ্রামের রাউজান আসনের দীর্ঘদিনের সংসদ সদস্য। ২০২৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বা আইসিটিতে হাজির করে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
অবাক করার মতো বিষয় হলো নেত্র নিউজ বা অন্যান্য প্রাথমিক অনুসন্ধানে চট্টগ্রামের ১৬ জুলাইয়ের ঘটনায় ফজলে করিমের নাম আসেনি। ট্রাইব্যুনালের কৌঁসুলিরা তাকে যে তিনটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছেন তা মূলত চট্টগ্রাম শহরের। অথচ ফজলে করিমের নির্বাচনী এলাকা রাউজান শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে।
আন্দোলন চলাকালে রাউজানে কোনো প্রাণঘাতী সংঘর্ষ বা নিহতের ঘটনা রেকর্ড করা হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে চট্টগ্রাম শহরের সাংগঠনিক দায়িত্বে না থাকা সত্ত্বেও কেন তাকে এই মামলায় প্রধান লক্ষ্যবস্তু করা হলো? ফজলে করিমের গ্রেপ্তারের পেছনে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রবল চাপ কাজ করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
রাউজানের সংসদ সদস্য থাকাকালে আধ্যাত্মিক সংগঠন হিসেবে পরিচিত মুনিরিয়া যুব তাবলিগের সঙ্গে ফজলে করিমের দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। তাঁর অনুসারীদের অভিযোগ যে এমপি থাকাকালীন তিনি মুনিরিয়ার অবৈধ কর্মকাণ্ড ও ভূমি দখল ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন।
অন্যদিকে মুনিরিয়ার দাবি যে ফজলে করিম তাদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছেন। ফজলে করিম গ্রেপ্তার হওয়ার পর মুনিরিয়ার সঙ্গে যুক্ত কিছু ছাত্রগোষ্ঠী এবং সম্রাট রোবায়েতের মতো ব্যক্তিরা রাজপথে সরব হন। তারা ট্রাইব্যুনালের সামনে বিক্ষোভ করা থেকে শুরু করে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ পর্যন্ত করেছেন যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ফজলে করিমের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা। এমনকি তার গুরুতর অসুস্থতার সময়ও তারা চিকিৎসার জন্য জামিন বা হাসপাতাল স্থানান্তরের বিরোধিতা করে ট্রাইব্যুনাল ঘেরাওয়ের হুমকি দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কৌঁসুলি আবদুল্লাহ নোমান স্বীকার করেছেন যে ফজলে করিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার ক্ষেত্রে তারা বাইরের কিছু গোষ্ঠীর চাপের মুখে রয়েছেন। তবে তিনি দাবি করেছেন যে তারা পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করছেন। কৌঁসুলি নোমান নিজেও এই মামলার দুর্বলতাগুলো অনুধাবন করেছেন।
তিনি স্পষ্ট করেছেন যে ফজলে করিমের নিজ এলাকা রাউজানে কোনো নৃশংসতা ঘটেনি এবং চট্টগ্রাম শহরের সাংগঠনিক পর্যায়ে তাঁর কোনো পদ ছিল না। তবে মুনিরিয়া পক্ষের অভিযোগ যে ফজলে করিম শহর এলাকায় অস্ত্র সরবরাহ করেছিলেন যা এখনো তদন্তাধীন।
তদন্তাধীন থাকা সত্ত্বেও একজন ৮৬ বছর বয়সী প্রবীণ রাজনীতিককে দীর্ঘকাল কারাগারে রাখা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার সুযোগ না দেওয়াকে মানবাধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। চট্টগ্রামের ১৬ জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও বাবর এবং রনির নাম বারবার আসলেও তারা এখন পলাতক। এদিকে রাউজানের সংসদ সদস্যকে কারাগারে রেখে তদন্ত চালিয়ে যাওয়াটা বিচারিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
ডেভিড বার্গম্যানের মতে আইসিটির কৌঁসুলিরা সম্ভবত মুনিরিয়া যুব তাবলিগের সংগঠিত প্রতিক্রিয়ার ভয়েই ফজলে করিমকে মুক্তি দিতে বা অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিতে সাহস পাচ্ছেন না। জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার হওয়াটা জাতীয় আকাঙ্ক্ষা কিন্তু সেই বিচার যদি প্রমাণের পরিবর্তে ব্যক্তিগত শত্রুতা কিংবা স্থানীয় রাজনৈতিক আধিপত্য পুনরুদ্ধারের হাতিয়ারে পরিণত হয় তবে তা ছাত্র জনতার বিপ্লবের মূল চেতনাকে কলঙ্কিত করবে। কাঠগড়ায় যেন কোনোভাবেই ভুল মানুষ দাঁড়িয়ে না থাকে এবং প্রকৃত অপরাধীরা যেন জনরোষের সুযোগ নিয়ে আড়ালে চলে না যায় এটাই এখন সাধারণ মানুষের দাবি।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন