একটি আনন্দঘন পারিবারিক অনুষ্ঠান শেষে ঘরে ফেরার পথে কুষ্টিয়ার বাইপাস সড়ক যেন মুহূর্তেই মৃত্যুপুরীতে পরিণত হলো। রাজশাহীতে বিয়ের দাওয়াতে অংশ নিয়ে ফেরার পথে অটোরিকশা উল্টে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি চলন্ত লরির নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন একই পরিবারের ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়সহ মোট পাঁচজন। আজ শনিবার বেলা দেড়টার দিকে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বাইপাস সড়কের ‘কুষ্টিয়া স্টোর পাম্প’ এলাকায় ঘটে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা।
নিহতদের মরদেহ কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পৌঁছালে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে হাসপাতালের আকাশ-বাতাস।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে অত্যন্ত আকস্মিকভাবে। আজ শনিবার দুপুরে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা বাইপাস সড়ক দিয়ে বটতৈল এলাকার দিকে যাচ্ছিল। অটোরিকশাটি চালাচ্ছিলেন রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চক রাজাপুর গ্রামের বাসিন্দা জাকারিয়া। অটোরিকশায় যাত্রী হিসেবে ছিলেন জাকারিয়ার শাশুড়ি ও তাদের আত্মীয়রা।
ঠিক সেই সময়ে বিপরীত দিক থেকে একটি বিশালাকৃতির গ্যাসবাহী লরি পাবনার অভিমুখে যাচ্ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কুষ্টিয়া স্টোর পাম্পের সামনে পৌঁছালে অটোরিকশাটির চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। দ্রুতগতির কারণে অটোরিকশাটি সড়কের ওপর উল্টে যায় এবং ঠিক সেই মুহূর্তেই বিপরীত দিক থেকে আসা লরিটির সঙ্গে সজোরে ধাক্কা লাগে। লরির ধাক্কায় অটোরিকশাটি মুহূর্তের মধ্যে দুমড়ে-মুচড়ে একটি লোহার পিণ্ডে পরিণত হয়।
ঘটনাস্থলেই অটোরিকশায় থাকা পাঁচ যাত্রীর মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়। স্থানীয়রা এবং ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত এগিয়ে এসে বাকি দুজনকে উদ্ধার করে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদেরও মৃত ঘোষণা করেন।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তারা প্রত্যেকেই একে অপরের ঘনিষ্ঠ এবং কুষ্টিয়া সদর উপজেলার খাজানগর এলাকার বাসিন্দা। নিহতরা হলেন- আমেনা খাতুন (৭৫), খাজানগর গ্রামের মৃত সিরাজুল ইসলামের স্ত্রী, কমেলা খাতুন (৭০) মৃত সিরাজুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী (আমেনা খাতুনের সতীন), জাকারিয়া আমেনা খাতুনের জামাতা, যিনি রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাসিন্দা এবং অটোরিকশাটি চালাচ্ছিলেন। আশরাফুল ইসলাম খাজানগর এলাকার বাসিন্দা। শিরিন খাতুন আশরাফুল ইসলামের স্ত্রী।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় জাকারিয়ার মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল। সেই খুশির অনুষ্ঠান শেষে আনন্দ নিয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিজের অটোরিকশায় করে খাজানগর ফিরছিলেন তারা। কিন্তু বাড়ির দোরগোড়ায় পৌঁছানোর আগেই চিরদিনের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল পাঁচটি জীবন।
বিকেলে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে গিয়ে দেখা যায় এক বিভীষিকাময় দৃশ্য। নিহতদের স্বজনরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বিলাপ করছেন। একজন স্বজন বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন, যার কান্নায় হাসপাতালের নার্স ও উপস্থিত সাধারণ মানুষও চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত হাসপাতালে ছুটে যান কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ইকবাল হোসেন। তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোকে সান্ত্বনা দেন এবং নিহতদের দাফন-কাফনের বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিবারের সদস্যদের কোনো অভিযোগ না থাকায় এবং মানবিক দিক বিবেচনা করে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার পর থেকেই পলাতক রয়েছেন ঘাতক লরিটির চালক ও তার সহকারী। তবে পুলিশ লরিটি জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে। চৌড়হাস হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জয়দেব গণমাধ্যমকে জানান, ‘লরিটি বর্তমানে আমাদের হেফাজতে রয়েছে। চালক ও হেলপার পালিয়ে গেলেও তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। অটোরিকশাটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যাওয়ায় এই বড় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।’
কুষ্টিয়ার এই বাইপাস সড়কটি সাম্প্রতিক সময়ে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে দ্রুতগামী লরি এবং ছোট যানবাহনের একই লেনে চলাচলের কারণে প্রায়ই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটছে। আজকের এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনা ও ছোট যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে ধরল।
একটি বিয়েবাড়ির আনন্দ যেভাবে মর্গ আর কাফনের কাপড়ে রূপ নিল, তা পুরো কুষ্টিয়া জেলাজুড়ে এক গভীর বিষাদ তৈরি করেছে। খাজানগর গ্রাম এখন নিস্তব্ধ; সেখানে আজ কোনো উনুন জ্বলেনি, শুধু কান্নার শব্দে প্রকম্পিত হচ্ছে বাতাস।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন