নরসিংদীর মাধবদীর শান্ত জনপদ এখন এক বীভৎস আতঙ্কে থমকে আছে। এক কিশোরীর আর্তনাদ আর বিচার না পাওয়ার হাহাকার মিশে গেছে কোতালিরচর দড়িকান্দীর সরিষা ক্ষেতে।
যে কিশোরীটি ১৫ দিন আগে ধর্ষণের শিকার হয়ে বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরেছিল, তাকেই শেষ পর্যন্ত প্রাণ দিতে হলো অত্যন্ত নির্মমভাবে। বাবার সামনে থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া সেই সন্তানকে ফিরে পাওয়া গেল নিথর ও রক্তাক্ত অবস্থায়।
এই ঘটনায় পুলিশ এখন পর্যন্ত ৫ জনকে গ্রেফতার করলেও মূল হোতা নূরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবে সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা, যারা বিচারের নামে অপরাধীদের রক্ষা করতে গিয়ে একটি তাজা প্রাণ কেড়ে নিতে পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনাটি শুরু হয় আজ থেকে প্রায় দুই সপ্তাহ আগে। স্থানীয় বখাটে নূরার নেতৃত্বে একদল দুর্বৃত্ত কিশোরী আমেনাকে (ছদ্মনাম) সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে। অভাবী ও সাধারণ পরিবারের মেয়েটি তার সম্ভ্রম হারানোর বিচার চেয়ে স্থানীয় মুরুব্বিদের শরণাপন্ন হয়েছিল। কিন্তু সমাজ এবং স্থানীয় রাজনীতি তাকে ন্যায়বিচার দেওয়ার বদলে বেছে নেয় ধামাচাপা দেওয়ার পুরনো কৌশল।
অভিযোগ উঠেছে, মহিষাশুরা ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আহম্মদ আলী দেওয়ান এই ধর্ষণের বিচারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। গ্রাম্য সালিশের কথা বলে তিনি ধর্ষক নূরার পরিবারের সাথে গোপনে সমঝোতা করেন। স্থানীয়দের দাবি, বড় অংকের টাকার বিনিময়ে তিনি ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং ধর্ষিতার পরিবারকে কোনো বিচার না দিয়েই গ্রাম ছাড়ার হুমকি দেন।
এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই অপরাধীদের মনে সাহস জুগিয়েছে। যখন একজন ধর্ষক দেখে যে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পার পাওয়া সম্ভব, তখন সে আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। আমেনার ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটিই ঘটেছে। বিচারের দাবি থেকে সরে না আসায় নূরার নেতৃত্বাধীন চক্রটি কিশোরীর পরিবারের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল।
গত বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) তারা সকল সীমা অতিক্রম করে। প্রকাশ্য দিবালোকে বাবার সামনে থেকেই কিশোরীকে জোরপূর্বক ছিনিয়ে নিয়ে যায় বখাটেরা। অসহায় বাবা তার সন্তানকে বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করলেও পেশীবল আর অস্ত্রের মুখে তিনি ছিলেন নিরুপায়।
অপহরণের পর কিশোরীকে পুনরায় সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়েছে বলে পরিবারের অভিযোগ। এরপর তার কণ্ঠরোধ করতে বা প্রতিহিংসা মেটাতে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পরদিন সকালে মহিষাশুরা ইউনিয়নের কোতালিরচর দড়িকান্দীর একটি সরিষা ক্ষেতে কিশোরীর লাশ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেয়।
সবুজে ঘেরা সরিষা ক্ষেতটি তখন রক্তে লাল হয়ে ছিল, যা দেশের বিচার ব্যবস্থার এক করুণ প্রতিচ্ছবি। ঘটনার পরপরই এলাকায় তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং অপরাধীদের শনাক্ত করতে পুলিশ অভিযানে নামে। নিহতের মা ফাহিমা বেগম বাদী হয়ে মাধবদী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন মহিষাশুরা ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি ও কথিত বিচারক আহম্মদ আলী দেওয়ান, তাঁর ছেলে ইমরান দেওয়ান, মূল অভিযুক্ত নূরার চাচাতো ভাই মোহাম্মদ আইয়ুব, এবায়েদুল্লাহ এবং হোসেন বাজার এলাকার বাসিন্দা গাফফার।
নরসিংদীর পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ-আল-ফারুক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আমরা ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছি। ইতোমধ্যে ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মূল অভিযুক্ত নূরাসহ বাকিদের গ্রেফতারে জেলা ও জেলার বাইরে সাঁড়াশি অভিযান চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে যে, গ্রাম্য সালিশি ব্যবস্থার নামে প্রভাবশালীরা কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। আহম্মদ আলী দেওয়ানের মতো রাজনৈতিক নেতার জড়িত থাকার বিষয়টি এলাকাকে স্তম্ভিত করেছে।
স্থানীয়দের মতে, যদি ১৫ দিন আগেই প্রথম ধর্ষণের বিচার হতো, তবে আজ এই কিশোরীকে লাশ হয়ে সরিষা ক্ষেতে পড়ে থাকতে হতো না। একজন প্রভাবশালী নেতার আশ্রয়ে ধর্ষকরা বেপরোয়া হয়ে ওঠা, নিজের চোখের সামনে সন্তান অপহৃত হওয়া এবং পরবর্তীতে তার লাশ পাওয়া এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ দিক। পুলিশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূল অভিযুক্ত নূরাকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে এই নৃশংসতার পেছনের কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন করা।
নরসিংদীর এই ঘটনা নিয়ে মানবাধিকার কর্মীরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এটি কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়, এটি বিচার ব্যবস্থার ওপর একটি চপেটাঘাত। যখন কোনো নারী ধর্ষণের শিকার হয়, তখন তাকে আইনি সহায়তা দেওয়ার বদলে সামাজিকভাবে একঘরে করা এবং রাজনৈতিকভাবে সমঝোতা করা একটি ফৌজদারি অপরাধ। আহম্মদ আলী দেওয়ানের গ্রেফতার হওয়া একটি ইতিবাচক দিক হলেও, এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে অপরাধীরা আরও শক্তিশালী হবে।
আমেনার রক্তে আজ নরসিংদীর মাটি ভিজেছে। তার অপরাধ ছিল সে তার ওপর হওয়া অন্যায়ের বিচার চেয়েছিল। একটি স্বাধীন দেশে বিচারের দাবি জানানোই যদি মৃত্যুর কারণ হয়, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জায়গা কোথায়? নরসিংদীর পুলিশ প্রশাসন এবং সরকারের কাছে এখন সাধারণ মানুষের একটাই দাবি, মূল হোতা নূরাকে গ্রেফতার করে দ্রুততম সময়ে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলানো এবং যারা বিচারের নামে টাকা আত্মসাৎ করে অপরাধীদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।
আমেনার মা ফাহিমা বেগমের আর্তনাদ এখন কেবল নরসিংদীতে নয়, সারা দেশের মানুষের বিবেককে নাড়া দিচ্ছে। বিচারহীনতার এই আবর্ত থেকে সমাজ কি কোনোদিন মুক্তি পাবে সেই প্রশ্ন এখন সবার মুখে।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন