পবিত্র ঈদুল ফিতর কড়া নাড়ছে দুয়ারে। প্রিয়জনের টানে ঘরে ফেরার চিরচেনা ব্যস্ততা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের কুমিরা ও সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া ঘাটে এখন বিরাজ করছে এক ভুতুড়ে নিস্তব্ধতা। খালের শুকনা চরে সারি সারি স্পিডবোট তুলে রাখা হয়েছে। নেই ইঞ্জিনের গর্জন, নেই যাত্রীদের হুড়োহুড়ি। কারণ একটাই, জ্বালানি তেলের চরম সংকট। বিশেষ করে অকটেনের অভাবে গত আট দিন ধরে এই নৌপথে স্পিডবোট চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে, যা সন্দ্বীপের লক্ষাধিক মানুষের ঈদযাত্রাকে এক বড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
সরেজমিনে কুমিরা ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, স্পিডবোটের চালক ও সহকারীরা কেউ ঘাটের চায়ের দোকানে, কেউবা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআইডব্লিউটিএর কাউন্টারের সামনে বিষণ্ণ মনে বসে আছেন। মাঝেমধ্যে দু-একজন যাত্রী আশার আলো নিয়ে কাউন্টারে আসছেন, কিন্তু অকটেন নেই, বোট চলবে না, এমন রূঢ় সত্য শুনে মলিন মুখে ফিরে যাচ্ছেন।
নাজমুল আলম নামের এক চালকের সহকারী আক্ষেপ করে বলেন, প্রতিদিন ভোরে কাজের আশায় ঘাটে আসি। সারাদিন বসে থেকে সন্ধ্যায় খালি হাতে বাড়ি ফিরি। ঈদ সামনে, কিন্তু পকেটে টাকা নেই। জ্বালানি না থাকলে আমাদের জীবনও যেন থেমে গেছে। শুধু নাজমুল নন, এই রুটে কাজ করা টিকিট মাস্টার, লাইনম্যানসহ প্রায় দেড় শতাধিক শ্রমিকের জীবিকা এখন অনিশ্চিত।
কুমিরা গুপ্তছড়া নৌপথে মূলত তিনটি কোম্পানি স্পিডবোট পরিচালনা করে। বর্তমানে আদিল এন্টারপ্রাইজ ও আরকে এন্টারপ্রাইজের মোট ২৫টি বোট সক্রিয় থাকলেও গত ৭ মার্চ থেকে তারা কোনো জ্বালানি সরবরাহ পায়নি। প্রতিদিন এখানে স্বাভাবিক চাহিদা প্রায় ৩,০০০ লিটার অকটেন এবং ঈদের সময় চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪,৫০০ লিটারে। ঈদ পরবর্তী সময় মিলিয়ে আগামী ২৮ মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৮০,০০০ লিটার অকটেনের প্রয়োজন।
আরকে এন্টারপ্রাইজের মালিক জগলুল হোসেন জানান, একদিকে আয় বন্ধ, অন্যদিকে ঘাটের ইজারা ও কর্মীদের বেতন, সব মিলিয়ে তারা দিশেহারা। স্পিডবোট বন্ধ থাকায় যাত্রীদের চাপ বাড়ছে কাঠের ট্রলার ও লঞ্চের ওপর। কিন্তু সেই ট্রলারগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেলও চাহিদার তুলনায় অনেক কম মিলছে।
সন্দ্বীপের বাসিন্দাদের জন্য স্পিডবোটই হলো যাতায়াতের দ্রুততম মাধ্যম। ইসমাইল হোসেন নামের এক যাত্রী বলেন, জরুরি কাজে সন্দ্বীপ যাওয়া দরকার, কিন্তু স্পিডবোট নেই। এখন জোয়ারের অপেক্ষায় বসে আছি, যদি কাঠের ট্রলার ছাড়ে। বাঁশবাড়িয়া গুপ্তছড়া রুটে ফেরি চলাচল করলেও ঈদের বিশাল যাত্রীচাপ সামলানো ফেরির পক্ষে অসম্ভব বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
বিশেষ করে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য উত্তাল সাগরে কাঠের ট্রলারে যাতায়াত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও কষ্টকর।
জ্বালানি সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেছেন সীতাকুণ্ডের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা ইউএনও মো. ফখরুল ইসলাম। তিনি জানান, ঈদ সামনে রেখে যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে তেল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হলো ঈদের আগেই যেন জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা যায়। তবে বিশ্ববাজারে তেলের অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ঘাটতি কত দ্রুত মেটানো সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না সাধারণ মানুষের।
যখন সারাদেশ ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন সন্দ্বীপের মানুষের কাছে ঈদ মানে এখন এক অনিশ্চিত সমুদ্রযাত্রা। স্পিডবোটগুলো যদি দ্রুত সচল না হয়, তবে এবার সন্দ্বীপগামী কয়েক হাজার যাত্রীকে কাঠের ট্রলারে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উত্তাল সাগর পাড়ি দিতে হবে। পারস্য উপসাগরের যুদ্ধের আঁচ সীতাকুণ্ডের ঘাটে যে আগুনের উত্তাপ ছড়াচ্ছে, তা নেভানোর জন্য এখন জরুরি সরকারি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন