বান্দরবানের সাঙ্গু নদীতে মোমবাতি প্রজ্বলন ও ফুল নিবেদনের মধ্য দিয়ে চাকমা সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান সামাজিক উৎসব ‘বিজু’ ও তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের ‘বিষু’ শুরু হয়েছে।
রোববার সকালে সাঙ্গু নদীর তীরে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের বিপুলসংখ্যক নারী-পুরুষ অংশ নেন।
ভোর থেকেই বিভিন্ন বয়সী মানুষ নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত হয়ে দলবেঁধে ফুল হাতে সাঙ্গু নদীর তীরে জড়ো হন। তাঁরা ‘জলবুদ্ধ’ ও ‘মা গঙ্গাদেবী’র উদ্দেশ্যে মোমবাতি প্রজ্বলন ও ফুল নিবেদন করেন। এ সময় অতীতের সকল ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা এবং আগামী বছর পরিবারসহ সবার সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করা হয়।
উৎসবের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সুফল চাকমা বলেন, অতীতের সকল দুঃখ ও গ্লানি মুছে পুরনো বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানাতেই এই আয়োজন। লজ্জাবতী তঞ্চঙ্গ্যা জানান, সকল দুঃখ যেন নদীর স্রোতের সাথে বিলীন হয়ে যায় এবং সামনের দিনগুলোতে যেন সবার কল্যাণ হয়, সেই প্রার্থনা নিয়ে বিষু উৎসব শুরু করা হয়েছে। অর্পিতা চাকমাও সবার সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিজু উৎসবের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের এই বৃহত্তম সামাজিক উৎসবটি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কাছে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। চাকমাদের কাছে ‘বিজু’, মারমা ও চাক সম্প্রদায়ের কাছে ‘সাংগ্রাইং’, ত্রিপুরাদের কাছে ‘বৈসু’, তঞ্চঙ্গ্যাদের কাছে ‘বিষু’, ম্রোদের কাছে ‘চাংক্রান’, খেয়াংদের কাছে ‘সাংলান’ এবং সাঁওতালদের কাছে এটি ‘বাহা উৎসব’ নামে পরিচিত। নাম ভিন্ন হলেও উৎসবের আনন্দ সবার জন্য এক ও অভিন্ন।
দীর্ঘকাল ধরে পালিত হয়ে আসা এই উৎসব পার্বত্য অঞ্চলের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। উৎসবকে ঘিরে বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি এই তিন পার্বত্য জেলার শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বইছে আনন্দের আমেজ। চলছে ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং নানা পদের পিঠা তৈরির প্রস্তুতি। চাকমা সম্প্রদায়ের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, ১২ এপ্রিল ‘ফুল বিজু’, ১৩ এপ্রিল ‘মূল বিজু’ এবং ১৪ এপ্রিল ‘গজ্জ্যাপজ্জ্যা’ নামে পরিচিত।
এ সময় ঘরোয়াভাবে ৩০ থেকে ৩৫ ধরনের সবজি দিয়ে তৈরি ‘পাজন’ তরকারি পরিবেশন করা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, অন্তত সাতটি বাড়িতে এই তরকারি খেলে রোগব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এই উৎসবে আনুষ্ঠানিক নিমন্ত্রণের কোনো রেওয়াজ নেই; বরং আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা একে অপরের বাড়িতে গিয়ে আতিথেয়তা গ্রহণ করেন।
অন্যদিকে, বান্দরবানে মারমা সম্প্রদায়ের সাংগ্রাইং উৎসব উদযাপনকে কেন্দ্র করে পুরনো ও নতুন কমিটির মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে এবার দুটি পৃথক আয়োজনে উৎসব পালিত হবে। নতুন কমিটি রাজার মাঠে এবং পুরনো কমিটি উজানি পাড়া সাঙ্গু নদীর বালুর চরে সাংগ্রাইংয়ের আয়োজন করবে।
১২ এপ্রিল রোয়াংছড়ি উপজেলায় তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী ‘ঘিলা খেলক গোল্ডকাপ টুর্নামেন্ট’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আগামী ১৩ এপ্রিল বান্দরবান শহরে সম্মিলিত সাংগ্রাইং র্যালি, ১৪ এপ্রিল বুদ্ধ বিম্ব স্নান ও পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান এবং ১৫ থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত ‘মৈত্রী পানি বর্ষণ’ বা জলকেলিসহ নানা বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন