গুলিবিদ্ধ ‘জুলাই যোদ্ধা’ সজীবের মামলা ঘিরে মাগুরায় নতুন রাজনৈতিক প্রশ্ন

মিরাজ আহমেদ, মাগুরা প্রকাশিত: মে ১২, ২০২৬, ০৩:৩১ পিএম
গুলিবিদ্ধ ‘জুলাই যোদ্ধা’ সজীবের মামলা ঘিরে মাগুরায় নতুন রাজনৈতিক প্রশ্ন

মাগুরায় গত ৫ই আগস্ট বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হওয়া ছাত্রদল নেতা ও ‘জুলাই যোদ্ধা’ মো. সজীবের দায়ের করা মামলাকে কেন্দ্র করে জেলা রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা, চাপান-উতোর ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে আদালতে মামলা দায়ের করার পর এখন তিনি নিজ দলের কিছু নেতার বিরুদ্ধেই মামলা প্রত্যাহারের চাপ, ভয়ভীতি ও রাজনৈতিক সমঝোতার অভিযোগ তুলেছেন।

অন্যদিকে বিএনপির স্থানীয় একাধিক নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, অতীতে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বিতর্কিত ব্যক্তি ও ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এখনো অটুট রয়েছে। যদিও অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।

আদালত সূত্রে জানা যায়, গত ৫ আগস্ট ২০২৪, সোমবার দুপুর আনুমানিক ১২টা ২০ মিনিটে মাগুরা শহরের পিটিআই স্কুলের সামনে মহাসড়কে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হন সজীব। 

মামলায় তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক সহিংসতার সময় তার পেটে গুলি লাগে এবং পরে দীর্ঘ সময় চিকিৎসাধীন থাকতে হয়।বাদী সজীব মাগুরা সদর উপজেলার মীরপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তিনি নিজেকে ৩ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের “রানিং সভাপতি” এবং “জুলাই যোদ্ধা” হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। মামলার নথির সঙ্গে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একটি ‘জুলাই যোদ্ধা স্বাস্থ্য কার্ড’-এর তথ্যও সংযুক্ত করা হয়েছে।

মামলায় মোট ১৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এদের মধ্যে মাগুরা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পংকজ কুমার কুন্ডু, সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সাইফুজ্জামান শেখর, মীর সুমন, ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোহাম্মদ আলমগীর, জুলকার নাইনসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীর নাম রয়েছে।

এ ছাড়া জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, পৌর আওয়ামী লীগের নেতা, বিভিন্ন ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, যুবলীগ নেতা ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়েছে। 

মামলায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রাজনৈতিক কর্মী, ঠিকাদার, ইউনিয়ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় মাগুরার রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।

মামলাটির বাদী সজীব অভিযোগ করেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর দীর্ঘ সময় চিকিৎসা ও আর্থিক সংকটের কারণে মামলা করতে পারেননি। সে সময় জেলা বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতা তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, সুস্থ হয়ে পরে মামলা করলেও সমস্যা হবে না। কিন্তু পরে মামলা দায়েরের উদ্যোগ নিলে একই মহলের একটি অংশ তাকে নিরুৎসাহিত করতে শুরু করে বলে দাবি তার।

সজীবের ভাষ্য, মামলা করার পর থেকেই বিভিন্নভাবে চাপ, ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে যাতে আমি মামলা প্রত্যাহার করি।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের দোসরদের সঙ্গে বিএনপির কিছু সিনিয়র নেতার গভীর যোগসাজশ রয়েছে। ঠিকাদারি, টেন্ডার ও বিভিন্ন আর্থিক স্বার্থে তারা একসঙ্গে কাজ করছেন।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাধীন প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। সংশ্লিষ্টদের কয়েকজন অভিযোগকে “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে দাবি করেছেন।

মামলার আসামি মোরশেদ আনোয়ার বলেন, আমি একজন পুলিশ সদস্য। ঘটনার দিন ঢাকায় মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করছিলাম। ডিউটিরত অবস্থায় ছিলাম। মাগুরা আইনজীবী সমিতির একজন আইনজীবী অসৎ উদ্দেশ্যে আমার নাম মামলায় সংযুক্ত করেছেন।

মামলার অপর আসামি ও মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সাইফুজ্জামান শেখর বলেন, মামলাটি গায়েবিভাবে দায়ের করা হয়েছে। এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ঘটনার সময় সরেজমিনে উপস্থিত ছিলেন না, এমন অনেককেও আসামি করা হয়েছে। ৫ আগস্টের ঘটনার প্রায় দুই বছর পর কীভাবে এই মামলা রুজু হলো, সেটিও প্রশ্নসাপেক্ষ। আমরা এই মামলার নিন্দা জানাই।

এ বিষয়ে মাগুরা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, গুলিতে আহত সজীব আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলাটি এখনো থানায় তদন্তের জন্য আসেনি। আদালত থেকে তদন্তের নির্দেশ পেলে তদন্তসাপেক্ষে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

আইনজীবীদের মতে, আদালতে দায়ের করা অভিযোগে বিপুল সংখ্যক আসামির নাম থাকলেও প্রতিটি অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক মামলায় প্রায়ই অতিরঞ্জন, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা কিংবা প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে আদালত ও তদন্ত সংস্থার নিরপেক্ষ ভূমিকাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

জেএইচআর