চিকন্দীর ঐতিহ্যবাহী আদালত ঘিরে বদলে যাচ্ছে জীবনমান

নুরুজ্জামান শেখ, শরীয়তপুর প্রকাশিত: জুন ১১, ২০২৬, ০৩:১৩ পিএম
চিকন্দীর ঐতিহ্যবাহী আদালত ঘিরে বদলে যাচ্ছে জীবনমান

শরীয়তপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরের একটি গ্রাম চিকন্দী। এ গ্রামে যে সিনিয়র সিভিল জজ আদালতটির কার্যক্রম চলছে, তা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৭২ সালে। তখন ব্রিটিশ শাসকেরা প্রথম মুন্সেফ আদালত নামে ওই আদালতটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৫৪ বছর ধরে গ্রামের ওই আদালতে দেওয়ানিসহ বিভিন্ন মামলার বিচার কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে।

চিকন্দী সিনিয়র সিভিল জজ আদালত ও আইনজীবী সমিতি সূত্রে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও মুন্সিগঞ্জের (বিক্রমপুরের) কিছু এলাকার মানুষকে আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য ব্রিটিশ শাসকেরা ১৮৬০ সালের দিকে পদ্মা নদীতে একটি ভ্রাম্যমাণ চৌকি আদালত পরিচালনা শুরু করেন। একটি জাহাজে করে নড়িয়া উপজেলার মুলফৎগঞ্জ এলাকায় ওই আদালতটির কার্যক্রম চলত। পরবর্তী সময়ে নদীভাঙনের কারণে ওই আদালতটি সদর উপজেলার চিকন্দী এলাকায় সরিয়ে আনা হয়।

গ্রামে ১৮৭২ সালে একটি গোলপাতার ঘর নির্মাণ করে তাতে প্রথমে আদালতের কার্যক্রম চালানো হয়। এরপর সেখানে দুটি ছোট পাকা ভবন গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে সাড়ে ১০ একর জমির ওপর আদালত এলাকা গড়ে তোলা হয়। ১৯২৬ সালে একতলা একটি আদালত ভবন নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে সেই ভবনের ৮টি কক্ষের মধ্যে সিনিয়র সিভিল জজ আদালতের কার্যক্রম চলছে।

শরীয়তপুর এলাকাটি ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত একটি মহকুমা ছিল। ১৯৮৪ সালে শরীয়তপুর জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন থেকে জেলা শহরে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়। সেখানে জেলার চারটি উপজেলার দেওয়ানি মামলার কার্যক্রম চললেও চিকন্দীতে শরীয়তপুর সদর ও জাজিরা উপজেলার দেওয়ানি মামলার বিচারকাজ চলতে থাকে। ওই আদালতটি আর জেলা শহরে সরিয়ে নেওয়া হয়নি।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, পুরো এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ ও বনজ গাছ রয়েছে। মাছ চাষের দুটি পুকুর রয়েছে। আদালত চত্বরে একটি মসজিদ, একতলা একটি আদালত ভবন ও বিচারকদের থাকার জন্য একটি একতলা ভবন রয়েছে। এর পাশেই রয়েছে চিকন্দী আইনজীবী সমিতি ভবন ও আইনজীবীদের চেম্বার।

আমলি আদালতের বিচারকাজ ছাড়া চিকন্দীতে পারিবারিক আদালত, অর্থঋণ আদালত, আইনগত সহায়তা (লিগ্যাল এইড) ও নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রম চলছে। আদালতটিতে দুজন বিচারক পদায়ন আছেন। তাঁদের একজন সদর ও আরেকজন জাজিরা আদালতে বিচারকাজ পরিচালনা করেন। বিচারকাজ পরিচালনায় সহায়তার জন্য আদালতটিতে ১৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন।

আদালতের প্রশাসনিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আদালতটিতে ৪ হাজার ৩০০ মামলার বিচারকাজ চলছে। প্রতিবছর আদালতটিতে ৬০০ থেকে ৭০০ মামলার রায় বা বিচার কাজ শেষ হয়।

১৫৪ বছর আগে চিকন্দী এলাকাটি কীর্তিনাশা নদীর তীরবর্তী হলেও বর্তমানে কীর্তিনাশা নদীর মূল প্রবাহ সাত-আট কিলোমিটার দূরে সরে গেছে। এখন আর চিকন্দী নদীর চরাঞ্চল নেই। সেখানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য গ্রাম, হাটবাজার, নির্মাণ করা হয়েছে উচ্চবিদ্যালয়, প্রাথমিক বিদ্যালয়, পোস্ট অফিস, ইউনিয়ন ভূমি অফিস, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

জাজিরার আক্কেল মাহমুদ মুন্সিকান্দি এলাকার জাকির হোসেন বেপারী বলেন, জমিজমা নিয়ে গত ৩ বছর একটি মামলা করেছেন চিকন্দী সিনিয়র সিভিল জজ আদালতে। কয়েক বছর ধরে তাঁর মামলার কার্যক্রম চলছে। তাঁর মামলাটি এখন বিচারিক পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিটি তারিখেই বিচারক উপস্থিত ছিলেন। এ আদালতটি জেলা শহরে না হলেও এ এলাকাটি প্রায় শহরে পরিণত হয়েছে।

এ ব্যাপারে চিকন্দী আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি আবদুল মান্নান তালুকদার বলেন, ৩০ বছর ধরে আইন পেশায় কাজ করছি। চিকন্দীর এ আদালত ব্রিটিশরা স্থাপন করেছেন। পাকিস্তান-ভারত স্বাধীন হওয়ার পরও আদালতটির কার্যক্রম চলেছে। জেলা স্থাপিত হওয়ার পরও এ আদালতের কার্যক্রম চিকন্দীতেই রাখা হয়েছে।

শরীয়তপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ফাহিমা আক্তার বলেন, জেলা শহর থেকে ১০-১২ কিলোমিটার দূরত্বে একটি চৌকি আদালত ব্রিটিশ আমল থেকে আছে। এখনো আদালতটির কার্যক্রম চিকন্দী নামের একটি গ্রামে পরিচালিত হচ্ছে। ওই আদালতটি জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অধীনে চলছে।

নবীন আইনজীবী হাফিজুর রহমান বলেন, চিকন্দী একটি গ্রাম। এখানে ব্রিটিশ শাসকদের প্রতিষ্ঠা করা একটি আদালত থাকায় পুরো এলাকাটির জীবনমান বদলে গেছে। এ আদালত ঐতিহ্য বহন করছে। এ আদালতের ক্যাম্পাসে খেলাধুলা করে, আদালতের পাশের স্কুলে পড়ালেখা করে শৈশব-কৈশোর পার করেছি। তাই আইন পেশায় পড়াশোনা করে এ আদালতেই কর্মজীবন শুরু করেছি।

চিকন্দী আইনজীবী সমিতির সভাপতি রুবায়েত আনোয়ার বলেন, আদালতটিতে মামলার জট নেই। মামলা নিষ্পত্তির হার খুবই ভালো। গ্রাম হলেও আদালতটিতে বিচারক, আইনজীবী ও সেবা প্রার্থীরা নির্বিঘ্নে ও স্বাচ্ছন্দ্যে মামলার সেবা পাচ্ছেন।

এএন