মাগুরায় পরিবার পরিকল্পনা সেবায় চরম সংকট, ১৮২ পদ শূন্য

মিরাজ আহমেদ, মাগুরা প্রকাশিত: জুন ১৬, ২০২৬, ০১:২৮ পিএম
মাগুরায় পরিবার পরিকল্পনা সেবায় চরম সংকট, ১৮২ পদ শূন্য

মাগুরা জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের বিশাল জনবল কাঠামো, শতাধিক সেবা ইউনিট ও বিস্তৃত মাঠপর্যায়ের নেটওয়ার্ক থাকলেও বাস্তবে ওষুধ সংকট, পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রীর ঘাটতি, অচল অ্যাম্বুলেন্স এবং দীর্ঘদিনের জনবল শূন্যতায় কার্যক্রম অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। জেলার ১০ লাখের বেশি মানুষকে সেবা দেওয়ার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কেন্দ্র ঘুরে এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, মাগুরা জেলায় ২৮টি ইউনিয়ন পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, ৬টি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র (আরডি) এবং ১৮১টি পরিবার পরিকল্পনা ইউনিট রয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম না থাকায় অনেক কেন্দ্রেই সেবার পরিধি সীমিত হয়ে পড়েছে।

মাঠপর্যায়ের কর্মী ও সেবা গ্রহীতাদের অভিযোগ, গত তিন বছর ধরে অধিকাংশ কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ নেই। ফলে রোগীদের প্রেসক্রিপশন দেওয়া হলেও ওষুধ কিনতে হচ্ছে বাইরের ফার্মেসি থেকে। জেলার চারটি উপজেলায় পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের স্টোরে প্রয়োজনীয় ওষুধের ঘাটতি রয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। বর্তমানে যে পরিমাণ ডিডিএস কিট সরবরাহ করা হচ্ছে, তা প্রকৃত চাহিদার তুলনায় নগণ্য।

একজন মাঠকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “অনেক সময় রোগীকে শুধু পরামর্শ দিয়েই ফিরিয়ে দিতে হয়। প্রয়োজনীয় সামগ্রী হাতে থাকে না।”

কনডম, পিল, ইনজেকটেবল ও ইমপ্লান্টের মতো মৌলিক পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রীর সরবরাহ নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। মাঠপর্যায়ের একাধিক সূত্র দাবি করেছে, গত দুই বছরে এসব সামগ্রীর সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অনেক কম ছিল। ফলে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটছে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ এ খাতের এমন অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, জেলায় পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের একমাত্র অ্যাম্বুলেন্সটি দীর্ঘদিন ধরে কার্যত সেবার বাইরে রয়েছে। কারণ, জ্বালানি বাবদ বরাদ্দ নেই। জেলা কার্যালয়ের অধীনে একটি অ্যাম্বুলেন্স ও দুটি জিপ থাকলেও জ্বালানি সংকটের কারণে নিয়মিত ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ফাতেমা ফিলিং স্টেশনের কাছে প্রায় আড়াই লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। ফলে জরুরি রোগী পরিবহন ও রেফারাল ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের জনবল চিত্রও উদ্বেগজনক। অনুমোদিত ৪৩৬টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২৫৪ জন। অর্থাৎ ১৮২টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। বিশেষ করে মাঠকর্মী, পরিদর্শক ও সেবা প্রদানকারী পর্যায়ে শূন্যপদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে। ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে সেবা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত কয়েক বছর ধরে রাজস্ব খাতে বেতন-ভাতা চলমান থাকলেও উন্নয়ন খাতে কার্যকর কোনো বরাদ্দ নেই। ফলে অবকাঠামো উন্নয়ন, যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, সেবা সম্প্রসারণ এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে। গত তিন বছরে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রশিক্ষণ বা কর্মশালার তথ্যও পাওয়া যায়নি।

পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের মেডিকেল, সার্জিক্যাল ও রিকুইজিটস (এমএসআর) সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জেলার বিভিন্ন ইউনিটে প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ঘাটতি থাকলেও চাহিদা, বরাদ্দ ও সরবরাহের প্রকৃত তথ্য জনসমক্ষে নেই।

সুশাসনকর্মীদের মতে, এমএসআর সরবরাহ, স্টক রেজিস্টার, গ্রহণ কমিটির প্রতিবেদন, যানবাহনের লগবুক, জ্বালানি ব্যয়ের হিসাব এবং রোগী পরিবহনের তথ্য প্রকাশ করা হলে প্রকৃত পরিস্থিতি স্পষ্ট হবে।

মাগুরা জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক গাজী বশির আহমেদ বলেন, “ওষুধ ও পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী কেন্দ্রীয়ভাবে অধিদপ্তর থেকে সরবরাহ করা হয়। স্থানীয় পর্যায়ে ক্রয়ের সুযোগ নেই। সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে।”

তিনি বলেন, “বর্তমানে জেলার বিরুদ্ধে কোনো অডিট আপত্তি বা তদন্ত প্রতিবেদন নেই।”

২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী মাগুরা জেলার জনসংখ্যা ১০ লাখ ৩৩ হাজার ১১৫ জন। এত বড় জনগোষ্ঠীর জন্য পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের সেবা কাঠামো থাকলেও বাস্তবে ওষুধ সংকট, সামগ্রী ঘাটতি, অচল অ্যাম্বুলেন্স ও বিপুল শূন্যপদ একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে। পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত যদি প্রয়োজনীয় সরবরাহ ও জনবল না পায়, তাহলে এর প্রভাব সরাসরি পড়বে জনস্বাস্থ্যের ওপর। জেলার পরিবার পরিকল্পনা ব্যবস্থার এই সংকট কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, বরং লাখো মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নও বটে।

এএন