খুলনা মহানগরীর শের-এ-বাংলা রোডের একটি সম্মেলন কক্ষে শনিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের ওপর পরিচালিত একটি নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘রূপসা’।
২০২৬ সালের বাংলাদেশ নির্বাচন প্রকল্পে ‘সিভিক রাইটস অ্যান্ড ইনক্লুসিভ ইলেকশন অবজারভেশন’ উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) দ্বারা অর্থায়িত এবং ইউরোপীয় পার্টনারশিপ ফর ডেমোক্রেসি (ইপিডি) দ্বারা সমর্থিত এই প্রকল্পের আওতায় দেশের ২৫টি সংসদীয় আসনের ৫০৯টি ভোটকেন্দ্রে ২০০ জন প্রশিক্ষিত নাগরিক পর্যবেক্ষক মোতায়েন করা হয়েছিল। তাঁরা প্রাক-নির্বাচন, নির্বাচন দিবস এবং নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেন।
রূপসার পর্যবেক্ষণ ফলাফল অনুযায়ী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সমূহ সাধারণভাবে ২০২৬ সালের সংসদীয় নির্বাচন ও গণভোটে শান্তিপূর্ণভাবে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছে। নির্বাচনী পরিবেশ সামগ্রিকভাবে সুশৃঙ্খল ছিল, অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র সময়মতো খোলা হয়েছে এবং নির্বাচনী সামগ্রী যথাযথভাবে সরবরাহ করায় ভোটাররা বড় কোনো বিঘ্ন ছাড়াই ভোট দিতে পেরেছেন।
তবে এই প্রশাসনিক সাফল্যের পাশাপাশি দলিত, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাস্তব অর্থবহ গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে কিছু স্থায়ী ঘাটতি ও চ্যালেঞ্জও চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র গঠনে সবার সমান ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জোর আহ্বান জানানো হয়।
পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রধান উদ্বেগ হিসেবে গণভোট প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে তথ্যভিত্তিক অংশগ্রহণের সীমিত মাত্রাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। রূপসার নির্বাহী পরিচালক হিরন্ময় মন্ডল জানান, অনেক সংখ্যালঘু ভোটার ভোটকেন্দ্রে পৌঁছানোর পর গণভোট সম্পর্কিত বিষয়গুলো জানতে পেরেছেন, যা ভোটার শিক্ষা ও নাগরিক সচেতনতা কার্যক্রমে বড় ধরনের ঘাটতির প্রতিফলন।
এ ছাড়া রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নির্বাচনী প্রার্থিতায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অপ্রতিনিধিত্বের চিত্রও ফুটে উঠেছে। ৩০০টি আসনের মধ্যে মাত্র ৫৭টি আসনে ৭৯ জন সংখ্যালঘু প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, যাদের মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র ১০ জন। চূড়ান্ত ফলাফলে তাঁদের মধ্য থেকে মাত্র ৪ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে পেরেছেন এবং তাঁরা সবাই একই রাজনৈতিক দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলনামূলক স্থিতিশীল হলেও পর্যবেক্ষণকৃত প্রায় ১১.৬ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে হয়রানি, চাপ প্রয়োগ কিংবা ভোটারদের চলাচলে সীমাবদ্ধতা তৈরির ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু অংশে নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিহিংসার আশঙ্কায় স্থানীয় সংখ্যালঘু জনগণ প্রকাশ্য রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশ নিতে অনীহা প্রকাশ করেছেন।
সার্বিক ফলাফল বিবেচনা করে রূপসা ইলেকশন অবজারভেশন টিম মন্তব্য করেছে যে, নির্বাচনে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা অর্জন করা সম্ভব হলেও প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি এখনও অধরা রয়ে গেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ভোট দিতে পারলেও সবসময় সমান, তথ্যভিত্তিক বা সম্পূর্ণ নিরাপদ পরিবেশ পায়নি। এই ব্যবধান দূর করতে তারা নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের জরুরি পদক্ষেপের দাবি জানিয়ে ৮টি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ পেশ করে।
প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে রূপসার নির্বাহী পরিচালক হিরন্ময় মন্ডল ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সংস্থার হেড অব ফাইন্যান্স ফিরোজা খানম, প্রকল্প পরিচালক শেখ মোস্তাফিজুর রহমান, প্রোগ্রাম অফিসার মো. রবিউল সিকদার, খাদিজা আক্তার, সহকারী প্রোগ্রাম অফিসার পূজারিনি বিশ্বাস এবং মো. সাফায়েত হোসেন।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন