বন্যায় ডুবে গেল পারিবারিক কবরস্থান, মরদেহ ভাসিয়ে নেওয়া হলো দূরের গোরস্থানে

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: জুলাই ১২, ২০২৬, ০৪:০০ পিএম
বন্যায় ডুবে গেল পারিবারিক কবরস্থান, মরদেহ ভাসিয়ে নেওয়া হলো দূরের গোরস্থানে

বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে বাড়িঘর, উঠান, কবরস্থান ও চলাচলের পথ। এমন পরিস্থিতিতে নিজ বাড়ির পাশে থাকা পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা সম্ভব হয়নি এক ব্যক্তিকে। শেষ পর্যন্ত স্বজন ও প্রতিবেশীরা ভেলায় করে তার মরদেহ প্রায় ৩০০ মিটার দূরে নিয়ে যান। পরে সেখান থেকে একটি অটোরিকশায় করে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের কবরস্থানে নিয়ে দাফন সম্পন্ন করা হয়।

হৃদয়বিদারক এ ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার জনার কেঁওচিয়া ইউনিয়নে। মারা যাওয়া ব্যক্তির নাম মোহাম্মদ ফোরকান (৬০)। তিনি পেশায় অটোরিকশাচালক ছিলেন। শুক্রবার (১০ জুলাই) বিকেল ৩টার দিকে তিনি মারা যান। একই দিন রাতেই জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। ফোরকানের বসতঘর, উঠান এবং পারিবারিক কবরস্থানও বন্যার পানির নিচে চলে যায়। এমন অবস্থায় শুক্রবার সকালেও তিনি বন্যার পানিতে জাল ফেলে মাছ ধরছিলেন। পরে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং নিজ বাড়িতেই মারা যান।

তবে চারপাশে পানি থাকায় তার মরদেহের গোসল নিজ বাড়িতে করানো সম্ভব হয়নি। একই কারণে পারিবারিক কবরস্থানেও দাফনের সুযোগ ছিল না। ফলে মরদেহ প্রথমে ভেলায় তুলে শুকনা স্থানে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে অটোরিকশায় করে উপজেলার দস্তিদারহাট এলাকায় নিয়ে গিয়ে গোসলসহ দাফনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়।

পরিবারের সদস্যরা জানান, রাত ১০টার দিকে ফকির মুড়া ঈদগাহ এলাকায় তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ওই এলাকার পাহাড়সংলগ্ন সরকারি খাস জমিতে তাকে দাফন করা হয়। জানাজার নামাজে ইমামতি করেন মরহুমের বড় ছেলে হাফেজ রাশেদুল ইসলাম।

জনার কেঁওচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. মহসিন ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, এখনো ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা বন্যার পানির নিচে রয়েছে। ফোরকানের বাড়ি, পারিবারিক কবরস্থান এবং যাতায়াতের পথ প্লাবিত থাকায় মরদেহ ভেলায় করে শুকনা জায়গায় নিয়ে যেতে হয়েছে। পরে অনেক দূরের একটি উন্মুক্ত সরকারি কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।

ফোরকানের আরেক ছেলে রাসেল উদ্দিন বলেন, তাদের বাড়ির পাশেই পারিবারিক কবরস্থান রয়েছে, যেখানে তার দাদা-দাদি এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের দাফন করা হয়েছে। তার বাবারও ইচ্ছা ছিল পরিবারের অন্য সদস্যদের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার। কিন্তু বন্যার কারণে সেই ইচ্ছা পূরণ করা সম্ভব হয়নি।

তিনি আরও জানান, বাবা মারা যাওয়ার সময় পারিবারিক কবরস্থানে কোমরসমান পানি ছিল। তাই বাধ্য হয়েই তাকে দূরের পাহাড়ি এলাকায় দাফন করতে হয়েছে।

টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে সাতকানিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যাকবলিত। গত দুই দিনে বৃষ্টি কিছুটা কমলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সাতকানিয়া পৌরসভাসহ উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন এখনো কমবেশি পানিতে প্লাবিত রয়েছে। এতে প্রায় চার লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রামের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী প্রশান্ত তালুকদার জানান, সাঙ্গু নদীর সাতকানিয়া অংশে পানি এখনো বিপৎসীমার ৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সাগরে উচ্চ জোয়ার এবং পাহাড়ে অব্যাহত বৃষ্টির কারণে পানি নামতে সময় লাগছে।

সাতকানিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) সামছুজ্জামান বলেন, বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও রোববার সকাল থেকে আবার ভারী বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ফলে নতুন করে বিভিন্ন এলাকায় পানি বাড়ার এবং আরও ঘরবাড়ি প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এএন