- ভিপি–জিএসসহ ২৪ পদে সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোটের জয়
- এজিএস পদে ছাত্রদলের একমাত্র সাফল্য
৪৪ বছর পর আবারও ইসলামী ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে (চাকসু) নেতৃত্বে ফিরেছে।
বৃহস্পতিবার ভোররাতে ঘোষিত সপ্তম চাকসু নির্বাচনের ফলে দেখা গেছে, ভিপি–জিএসসহ ২৬টি পদে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মধ্যে ২৪টি পদে বিজয়ী হয়েছে ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট’।
একমাত্র এজিএস (সহ–সাধারণ সম্পাদক) পদে জয় পেয়েছে ছাত্রদল সমর্থিত প্রার্থী।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বশেষ চাকসু নির্বাচন হয়েছিল ১৯৮১ সালে। সেই নির্বাচনে ভিপি পদে জয়ী হয়েছিলেন ছাত্রশিবিরের জসিম উদ্দিন সরকার, জিএস হন আবদুল গাফফার। চার দশকেরও বেশি সময় পর আবারও শিবির সমর্থিত প্রার্থীরা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নেতৃত্বে ফিরলেন।
বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে চারটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মনির উদ্দিন সপ্তম চাকসু নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা করেন। ফল ঘোষণার সময় নির্বাচন ভবনের সামনে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থী, তাদের সমর্থক এবং সাংবাদিকরা।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রার্থী ও শিক্ষার্থীরা দায়িত্বশীল ভূমিকা রেখেছেন। নির্বাচনের দিন ক্যাম্পাসে কোনো বড় ধরনের অনিয়ম বা সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি।
নির্বাচনে বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ১৪টি আবাসিক হল ও একটি হোস্টেলের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। ভোটার সংখ্যা ছিল ২৭ হাজার ৫১৬। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ শেষে রাতভর গণনা চলে।
ভিপি ও জিএস পদে শিবিরের নিরঙ্কুশ জয়
ভিপি (সহ–সভাপতি) পদে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্রার্থী মোহাম্মদ ইব্রাহিম হোসেন ৭ হাজার ৯৮৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী, ছাত্রদল সমর্থিত প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন পান ৪ হাজার ৩৭৪ ভোট।
ইব্রাহিম হোসেন বর্তমানে ইতিহাস বিভাগে এমফিলের শিক্ষার্থী এবং সংগঠনটির চট্টগ্রাম মহানগর দক্ষিণ শাখার সভাপতি।
জিএস (সাধারণ সম্পাদক) পদেও নিরঙ্কুশ বিজয় এসেছে একই প্যানেলের। ইতিহাস বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী এবং ছাত্রশিবির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাহিত্য সম্পাদক সাঈদ বিন হাবিব ৮, ৩১৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের মো. শাফায়াত পান ২,৭৩৪ ভোট।
২৬টি পদের মধ্যে মাত্র একটি পদে জয় পেয়েছে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেল। এজিএস (সহ–সাধারণ সম্পাদক) পদে আইয়ুবুর রহমান ৭ হাজার ১৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ছাত্রশিবিরের সাজ্জাদ হোছন, যিনি পেয়েছেন ৫ হাজার ৪৫ ভোট।
আইয়ুবুর রহমান রাজনৈতিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। ফল ঘোষণার পর তিনি বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের স্বার্থে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি। চাকসুর নেতৃত্বে একটি ইতিবাচক প্রতিযোগিতা ফিরেছে—এটাই এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
হলভিত্তিক ফলাফল: শিবিরের অগ্রগতি, ছাত্রদলের সীমিত সান্ত্বনা
প্রাথমিকভাবে দশটি আবাসিক হলের ফলাফল পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ছয়টি হলে ভিপি পদে শিবির সমর্থিত ইব্রাহিম হোসেন এগিয়ে ছিলেন, আর চারটি হলে এগিয়েছিলেন ছাত্রদলের সাজ্জাদ হোসেন।
মোট ভোটের হিসাবে ইব্রাহিম পেয়েছেন ৪ হাজার ৬১৮ ভোট, যেখানে সাজ্জাদ পেয়েছেন ২ হাজার ৮৫৮ ভোট।
জিএস পদে শিবিরের সাঈদ বিন হাবিব ৪ হাজার ৬৯৭ ভোটে এগিয়ে ছিলেন, আর ছাত্রদলের শাফায়াত পান ১ হাজার ৭৮৯ ভোট।
অন্যদিকে এজিএস পদে নয়টি হলে এগিয়ে ছিলেন ছাত্রদলের আইয়ুবুর রহমান, যিনি পেয়েছেন ৪ হাজার ২০৭ ভোট; তার প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের সাজ্জাদ হোছন পেয়েছেন ৩ হাজার ৭৭ ভোট।
নতুন মুখ ও নারী নেতৃত্ব
চাকসুতে এবার প্রথমবারের মতো ক্রীড়া সম্পাদক পদে একজন ছাত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী তামান্না মাহবুব নির্বাচিত হয়ে এই পদে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা এখন নেতৃত্বের অংশ হতে পারছেন এটাই আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকসু গঠিত হয় ১৯৭০ সালে। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে কয়েক দফা নির্বাচন হলেও ১৯৮১ সালের পর চাকসুর কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। এরপর নানা সময়ে নির্বাচনের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করলেও প্রশাসনিক জটিলতা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে নির্বাচন আর অনুষ্ঠিত হয়নি।
১৯৮১ সালের সেই নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের জসিম উদ্দিন সরকার ভিপি এবং আবদুল গাফফার জিএস পদে বিজয়ী হয়েছিলেন। এরপর টানা চার দশকের বেশি সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচিত ছাত্রসংসদ ছিল না।
চলতি বছরের শুরুতে ঘোষণার পর ছাত্রসংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হয়, যা শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হয়।
ফল ঘোষণার পর ক্যাম্পাসে উল্লাসে ফেটে পড়ে শিবির সমর্থিত শিক্ষার্থীরা। ভোরের আলো ফোটার আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ ক্যাম্পাস থেকে শুরু করে প্রশাসনিক ভবন পর্যন্ত মিছিল আর স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে।
ইব্রাহিম হোসেন ফল ঘোষণার পর বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের ঐক্যের প্রতীক হতে চাই। এই বিজয় কোনো দলের নয়, এটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিশ্বাসের প্রতিফলন।
অন্যদিকে ছাত্রদল সমর্থিত প্রার্থীরা ফলাফলে চাকসুর ভোট গ্রহণ শেষে পক্ষপাতেয় অভিযোগ ।মেনে না নিয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে বরং বলেছে, “চাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ধ্বংস হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণকারীরা বলেছেন, ১৯৮১ সালের পর চাকসুর নেতৃত্ব শিবিরের হাতে যাওয়া একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ক্যাম্পাস রাজনীতির মানচিত্রে পরিবর্তনের সূচনা ঘটেছে।
নির্বাচনে অংশ নেয় মোট পাঁচটি শিক্ষার্থী সংগঠনভিত্তিক প্যানেল সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট (ছাত্রশিবির), স্বাধীন শিক্ষার্থী ফোরাম (ছাত্রদল), প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্য (ছাত্র ইউনিয়ন–ছাত্র ফ্রন্ট), ব্লু-গ্রিন স্টুডেন্টস অ্যালায়েন্স (ছাত্রলীগের ভিন্নধারার শিক্ষার্থীরা) এবং নির্দলীয় শিক্ষার্থী পরিষদ।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানান, ভোটগ্রহণে কোনো সহিংসতা ঘটেনি এবং প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী ভোট প্রদান করেছেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পর চাকসু নির্বাচন শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। আশা করি, নির্বাচিত নেতারা নিজেদের সংগঠনের সীমা ছাড়িয়ে শিক্ষার্থীদের সার্বিক কল্যাণে কাজ করবেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ বলছেন, চাকসু নির্বাচন শুধু নেতৃত্বের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং ক্যাম্পাস রাজনীতিতে একটি নতুন ভারসাম্যের সূচনা।
সাবেক ছাত্রনেতা এবং বর্তমান শিক্ষকরা বলেন, চাকসুর পুনর্জাগরণ মানে শিক্ষার্থীদের মতামত প্রকাশের নতুন প্ল্যাটফর্ম। এটি যদি সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হবে।
দীর্ঘ ৪৪ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকসু নির্বাচন শিক্ষার্থীদের মাঝে নতুন প্রাণ ফিরিয়ে এনেছে। ফলাফল হয়তো এক পক্ষের জন্য বিজয়, কিন্তু পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এটি গণতান্ত্রিক চর্চার পুনর্জন্ম।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্যানেল ২৪টি পদে জয়ী হয়ে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছে; অন্যদিকে ছাত্রদলের প্যানেলও একটি পদে জিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মান রেখেছে।
এখন প্রশ্ন একটাই এই নির্বাচিত ছাত্রসংসদ কি সত্যিই শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশার নেতৃত্ব দিতে পারবে? সময়ই তার উত্তর দেবে।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন