পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ছাত্রদলের এক নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। নিহত ছাত্রনেতার নাম মো. জোবায়েদ হোসেন (২২)। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯–২০ শিক্ষাবর্ষের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন।
রোববার রাতে আরমানিটোলার মাহুতটুলিতে পানির পাম্প গলির নূর বক্স লেনের একটি ভবনের সিঁড়ি থেকে তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে সেটি মিটফোর্ড হাসপাতালের (স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল) মর্গে পাঠানো হয়।
পুলিশ ও সহপাঠীদের তথ্যমতে, জোবায়েদ ওই এলাকার একটি বাসায় উচ্চমাধ্যমিক পড়ুয়া এক তরুণীকে নিয়মিত প্রাইভেট পড়াতেন। রোববার সন্ধ্যায়ও তিনি স্বাভাবিকভাবে পড়াতে যান। পরে রাত ৯টার পর স্থানীয় লোকজন ভবনের তৃতীয় তলার সিঁড়িতে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন।
খবর পেয়ে বংশাল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। জোবায়েদের গলায় ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। তার গায়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগোসংবলিত জার্সি ছিল, যাতে নামও লেখা ছিল। স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে সহপাঠী ও ছাত্রদল নেতাকর্মীরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন।
পুলিশ জানান, নিহত যেই তরুণীকে প্রাইভেট পড়াতেন তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। পাশাপাশি ওই বাসায় অবস্থানকারী তার মামা ডা. ওয়াহিদকেও পুলিশের নজরে আনা হয়েছে।
নিহতের সহপাঠী ফরহাদ হোসেন বলেন, জোবায়েদকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমরা জানতে পেরেছি, মেয়েটির মামা ডা. ওয়াহিদ ঘটনাস্থলে ছিলেন। তিনিই নাকি জোবায়েদের পালস চেক করেছেন এবং ৯৯৯–এ ফোন দিয়েছেন। তাহলে তিনি হত্যাকাণ্ডের আগে কীভাবে জানলেন যে ঘটনাটি ঘটেছে?
তিনি আরও দাবি করেন, ছয় ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও পুলিশ এখনো হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি। শুধু ওই মেয়েকে নয়, তার মামাকেও জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনতে হবে।
রোববার রাত ১১টার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা খবর পেয়ে পুরান ঢাকায় নূর বক্স লেন ও আশপাশের এলাকায় জড়ো হন। প্রথমে তারা ঘটনাস্থল ঘিরে বিক্ষোভ শুরু করেন, পরে মরদেহ পুলিশ নিয়ে যাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়।
মিছিলটি বাহাদুর শাহ পার্ক, শাঁখারী বাজার মোড়, জজকোর্ট, রায় সাহেব বাজার হয়ে তাঁতীবাজার মোড়ে এসে অবরোধে পরিণত হয়। রাত সাড়ে ১২টার দিকে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বংশাল থানার সামনে টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করেন।
বিক্ষোভে শিক্ষার্থীরা স্লোগান দেন, আমার ভাই মর্গে, খুনি কেন বাইরে? রাস্তায় ছাত্র মরে, প্রশাসন কী করে? বিচার চাই, জোবায়েদ হত্যার বিচার চাই। প্রশাসনের দালালরা, হুঁশিয়ার সাবধান।
রাত পৌনে দুইটা পর্যন্ত ঘটনাস্থলে বিক্ষোভ চলছিল। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করে।
ঘটনার পর ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম বলেন, আমরা প্রশাসনের পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছি। জোবায়েদ হত্যার সঙ্গে জড়িত দুজনকে গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে। এই হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই ন্যায্যতার ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, ছাত্রনেতাকে হত্যা করে ছাত্র রাজনীতিকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে বিচার চাই। যদি প্রশাসন ব্যর্থ হয়, তাহলে সারাদেশে প্রতিবাদ কর্মসূচি দেওয়া হবে।
বংশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে হত্যার ঘটনায় আমরা একজন তরুণীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এটি পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতা থেকে ঘটে থাকতে পারে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি জানান, ফরেনসিক টিম ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা ছুরি ও পোশাক উদ্ধার করেছে। সেগুলো পরীক্ষার জন্য প্রেরণ করা হবে।
নিহত জোবায়েদের সহপাঠীরা বলেন, তিনি পড়াশোনায় ভালো ছিলেন এবং রাজনীতির পাশাপাশি সামাজিক কাজেও যুক্ত ছিলেন।
পরিসংখ্যান বিভাগের এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জোবায়েদ আমাদের বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। এমন একটি হত্যাকাণ্ডে তাকে হারাতে হবে, এটা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী জানান, জোবায়েদ ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও সহিংসতায় জড়িত ছিলেন না। বরং তিনি বেশিরভাগ সময় পড়াশোনা ও সংগঠনের সাংগঠনিক কাজেই ব্যস্ত থাকতেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রক্টর বলেন, আমরা ঘটনার বিষয়ে অবগত আছি। পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিহত শিক্ষার্থীর পরিবার ও সহপাঠীদের পাশে আছে।
তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি যাতে শান্ত থাকে সে জন্য আমরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। ক্যাম্পাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতাও নেওয়া হয়েছে।
রাতভর বিক্ষোভ শেষে শিক্ষার্থীরা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে অবস্থান কর্মসূচি নেন। তারা ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন হত্যাকারীরা গ্রেপ্তার না হলে সোমবার থেকে তারা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন ও সড়ক অবরোধসহ কঠোর কর্মসূচিতে যাবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার আমরা চাই। প্রশাসন যদি ব্যর্থ হয়, আমরা রাজপথে নামব।
পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন থেকে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত হতে সময় লাগবে। তরুণীর পরিবারও তদন্তের আওতায় আসবে।
ফরেনসিক বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, জোবায়েদের গলায় ধারালো অস্ত্রের আঘাত পাওয়া গেছে। মৃত্যুর সময়ের পার্থক্য অনুযায়ী এটি হত্যাকাণ্ড বলেই মনে হচ্ছে।
রাত আড়াইটার দিকে বিক্ষোভ শেষে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ফিরে এসে ‘শহীদ জোবায়েদ’ স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বলন করেন। তারা দোয়া মাহফিলের ঘোষণা দেন এবং বলেন, জোবায়েদের নামে স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবিও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে উত্থাপন করা হবে।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন