অবশেষে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ

নিজস্ব প্রতিবেদক  প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৯, ২০২৬, ১১:৫৫ এএম
অবশেষে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ
ফাইল ছবি

দীর্ঘ প্রতীক্ষা, আন্দোলন এবং প্রশাসনিক পর্যালোচনার পর অবশেষে আলোর মুখ দেখল রাজধানীর সরকারি সাত কলেজের সমন্বয়ে গঠিত ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’। 

সোমবার সকালে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ থেকে এই সংক্রান্ত চূড়ান্ত অধ্যাদেশের গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে।

এর আগে গত ২২ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই অধ্যাদেশের চূড়ান্ত খসড়া অনুমোদিত হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা খালিদ মাহমুদ স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক অগ্রযাত্রার বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

গত কয়েক বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাতটি সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরা সেশনজট নিরসন, দ্রুত ফলাফল প্রকাশ এবং প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন করে আসছিলেন। ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ গঠনের মূল লক্ষ্য হলো সাতটি ঐতিহ্যবাহী কলেজের একাডেমিক মান উন্নয়ন, প্রশাসনিক জটিলতা ও সেশনজট স্থায়ীভাবে দূর করা ও একটি সমন্বিত ও আধুনিক উচ্চশিক্ষা কাঠামো তৈরি করা।

নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় রাজধানীর প্রধান সাতটি সরকারি কলেজ সংযুক্ত হিসেবে পরিচালিত হবে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ,  সরকারি বাংলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজ।

অধ্যাদেশে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, সংযুক্ত হওয়ার পরেও প্রতিটি কলেজের নিজস্ব ঐতিহ্য, অবকাঠামো এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অধিকার আগের মতোই অক্ষুণ্ণ থাকবে।

ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি একটি পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হবে। গেজেট অনুযায়ী, এর প্রশাসনিক কাঠামোতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদাধিকারবলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সিনেট কর্তৃক মনোনীত প্যানেল থেকে আচার্য উপাচার্য নিয়োগ দেবেন। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য শক্তিশালী সিনেট, সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিল গঠন করা হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, পরীক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়মিতভাবে পরিদর্শন ও মূল্যায়নের ক্ষমতা থাকবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর।

বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রথাগত শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে আধুনিক ও কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা, বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, আইন ও চারুকলাসহ বিভিন্ন বিষয়ের জন্য পৃথক পৃথক 'স্কুল' থাকবে। প্রতিটি স্কুলের প্রশাসনিক ও একাডেমিক প্রধান হিসেবে থাকবেন একজন ‘হেড অব স্কুল’।

সাতটি কলেজের পাঠদান, পরীক্ষার রুটিন এবং খাতা মূল্যায়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিন্ন সময়সূচি অনুযায়ী পরিচালিত হবে। এর ফলে এক কলেজের সাথে অন্য কলেজের ফলাফলের বৈষম্য দূর হবে।

স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রির পাশাপাশি এখন থেকে এই কলেজগুলোতে কেন্দ্রীয়ভাবে এমফিল (M.Phil) ও পিএইচডি (Ph.D) প্রোগ্রাম চালু করা হবে। এছাড়া শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য উচ্চতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে।

শিক্ষার্থীদের জন্য এই অধ্যাদেশে বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। এতে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল এবং একটি সমন্বিত কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীরা মূল ক্যাম্পাস বা সাতটি কলেজের যেকোনো একটিতে মেধা তালিকা অনুযায়ী ভর্তির সুযোগ পাবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত আবাসন বা হল সুবিধা নিশ্চিত করার বিধান রাখা হয়েছে এবং সুস্থ ধারার নেতৃত্ব বিকাশে ডাকসু’র আদলে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বিশেষ ব্যবস্থাও গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের সার্বিক বিকাশ নিশ্চিত করতে খেলাধুলা, বিতর্ক ও সাংস্কৃতিকসহ বিভিন্ন সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রমে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির জন্য একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত স্থায়ী ক্যাম্পাসের অবকাঠামো পুরোপুরি প্রস্তুত না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সাময়িকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার এই গেজেট প্রকাশ কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর স্বপ্নের বাস্তবায়ন। একই ছাতার নিচে সাত কলেজের এই যাত্রা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা মানচিত্রে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে গণ্য হবে। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা আর দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যার সমাধানই এখন এই নতুন প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

এএন