আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ঐতিহাসিক গণভোটকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা অর্জনে বড় পদক্ষেপ নিল বর্তমান নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও বিদেশি প্রতিনিধিদের সামনে নির্বাচনের সামগ্রিক প্রস্তুতি এবং নিরাপত্তা পরিকল্পনা বিশদভাবে তুলে ধরেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।
রোববার রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত এই বিশেষ ব্রিফিংয়ে সিইসি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আসন্ন নির্বাচনে এমন এক ‘নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাবলয়’ তৈরি করা হবে, যেখানে সাধারণ ভোটাররা নির্ভয়ে কেন্দ্রে গিয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে গঠিত নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে নির্বাচনের রোডম্যাপ অনুযায়ী কতটুকু অগ্রসর হয়েছে, তা কূটনীতিকদের অবহিত করাই ছিল এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন শক্তিধর দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সিইসি সাংবাদিকদের জানান, নির্বাচন কমিশন একটি 'লুকোচুরিহীন' এবং সম্পূর্ণ 'স্বচ্ছ' নির্বাচন উপহার দিতে বদ্ধপরিকর। বৈঠকে মূলত তিনটি প্রধান দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে:
১. নিরাপত্তা পরিকল্পনা: ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা এবং ভোটারদের সুরক্ষা।
২. আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন: সশস্ত্র বাহিনীসহ সকল বাহিনীর সমন্বিত ভূমিকা।
৩. প্রাযুক্তিক ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি: পোস্টাল ব্যালট এবং নির্বাচনের কারিগরি দিক।
নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কূটনীতিকদের বিশেষ আগ্রহ ছিল। এর জবাবে সিইসি নাসির উদ্দিন একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামোর বর্ণনা দেন। তিনি জানান, এবারের নির্বাচনে কেবল পুলিশ বা বিজিবি নয়, বরং সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী তিন বাহিনীর সদস্যরাই সরাসরি মাঠে থাকবেন। এর পাশাপাশি র্যাব এবং আনসার বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হবে।
সিইসি’র ভাষ্যমতে, 'ভোট দিয়ে ভোটাররা যেন নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করাই আমাদের অগ্রাধিকার। আমরা যে নিরাপত্তার পরিকল্পনা সাজিয়েছি, তাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা ভীতি প্রদর্শনের সুযোগ থাকবে না।'
কূটনীতিকদের প্রশ্ন ও ইসির অবস্থান
বৈঠকে উপস্থিত কূটনীতিকরা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরামর্শ না দিলেও নির্বাচনের কারিগরি বিষয়গুলো নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেন। বিশেষ করে:
পোস্টাল ব্যালট: প্রবাসী এবং দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়াটি কতটা সহজ ও স্বচ্ছ হবে, তা নিয়ে তারা জানতে চান।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা: সেনাবাহিনী মোতায়েনের পরিধি এবং তাদের ক্ষমতা নিয়ে আলোচনা হয়।
আস্থার পরিবেশ: একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে কমিশনের সক্ষমতা কতটুকু, সে বিষয়ে কূটনীতিকরা কমিশনের বর্তমান প্রস্তুতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলে সিইসি দাবি করেন।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই নির্বাচনে নির্দিষ্ট কিছু দলের অনুপস্থিতি (যেমন আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত থাকা) নিয়ে কূটনীতিকদের পক্ষ থেকে কোনো প্রশ্ন বা উদ্বেগ জানানো হয়নি। এটি কমিশনের জন্য একটি স্বস্তির বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের প্রধান লক্ষ্য এখন বিশ্ববাসীর কাছে এই নির্বাচনকে 'মডেল' হিসেবে উপস্থাপন করা। ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর এটিই প্রথম নির্বাচন, যেখানে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের পরীক্ষা হবে। সিইসি নাসির উদ্দিন স্পষ্টভাবে বলেছেন, 'আমরা চাই একটি অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। বিদেশি প্রতিনিধিরা আমাদের প্রস্তুতি দেখে আস্থাশীল হয়েছেন।'
বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে অতীতে আন্তর্জাতিক মহলে নানা বিতর্ক ও প্রশ্ন ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে বিদেশি কূটনীতিকদের ডেকে এনে প্রস্তুতির খতিয়ান দেওয়া এবং তাদের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়াকে একটি ইতিবাচক ‘কূটনৈতিক কৌশল’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। এতে করে নির্বাচনের আন্তর্জাতিক বৈধতা পাওয়ার পথ প্রশস্ত হবে।
বিশেষ করে একই দিনে অনুষ্ঠিতব্য গণভোট (সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত) নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের যে কৌতূহল ছিল, তা এই ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে অনেকটা নিরসন হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে যে ‘নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা’র প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নের ওপরেই নির্ভর করছে ভোটারদের উপস্থিতি। সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিনের এই দৃঢ় অবস্থান যদি বাস্তবে প্রতিফলিত হয়, তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। এখন দেখার বিষয়, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ব্যালট বক্সের নিরাপত্তা এবং মাঠের শৃঙ্খলা কমিশন কতটুকু বজায় রাখতে পারে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন