নির্বাচনি দায়িত্ব পালনকালে মারা গেলে পরিবার পাবে ১০ লাখ টাকা

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: জুন ১০, ২০২৬, ০১:৫৪ পিএম
নির্বাচনি দায়িত্ব পালনকালে মারা গেলে পরিবার পাবে ১০ লাখ টাকা

ভোটের মাঠ এবং ভোটার তালিকা তৈরির কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা এখন থেকে বড় ধরনের আর্থিক ও জীবন বীমার মতো নিরাপত্তা সুবিধা পাবেন। জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকালে কোনো কর্মকর্তা, কর্মচারী কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য বড় ধরনের শারীরিক ক্ষতি বা হামলার শিকার হলে তাঁদের পরিবারকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত এককালীন আর্থিক অনুদান দেবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই অনুদানের সর্বনিম্ন পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ হাজার টাকা।

সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে এই সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে নতুন সুরক্ষানীতিমালা প্রকাশ করা হয়েছে।

নতুন এই নীতিমালার আওতায় নির্বাচনের মাঠে দায়িত্ব পালনের সময় দুর্বৃত্তদের সহিংস হামলা কিংবা মারাত্মক পথদুর্ঘটনায় কেউ জীবন হারালে তাঁর পরিবারকে এককালীন ১০ লাখ টাকা দেওয়া হবে। আর ডিউটিরত অবস্থায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে কিংবা স্বাভাবিকভাবে কেউ মারা গেলে তাঁর পরিবার পাবে সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা। 

মূলত আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দিন থেকেই এই ঐতিহাসিক এবং জনকল্যাণমূলক নীতিমালাটি দেশজুড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হতে যাচ্ছে। নির্বাচনী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যেকোনো ধরনের অঙ্গহানি, দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতা কিংবা ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ মেটাতে নির্বাচন কমিশন নিজেদের মূল বাজেট থেকে এই বিশাল অঙ্কের তহবিল সরবরাহ করবে।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, ‘নির্বাচনে ও ভোটার তালিকা প্রণয়ন সংক্রান্ত কার্যক্রমে দায়িত্ব পালনকালে অসুস্থ/গুরুতর অসুস্থ/আহত/গুরুতর আহত কর্মকর্তা/কর্মচারী ও মৃত ব্যক্তির পরিবারকে আর্থিক সহায়তা/অনুদান প্রদান নীতিমালা-২০২৬’ নামের এই বিশেষ স্কিমটি কেবল জাতীয় সংসদ নির্বাচনই নয়, বরং দেশের সব ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা ও জেলা পরিষদ নির্বাচনে নিয়োজিত সব কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং মাঠের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।

নীতিমালায় অনুদানের অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে দুটি সুনির্দিষ্ট ক্যাটাগরি করা হয়েছে। প্রথম ক্যাটাগরি অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকালে উগ্রপন্থীদের হামলা কিংবা বাহন দুর্ঘটনায় কোনো কর্মী মারা গেলে তাঁর পরিবার পুরো ১০ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা পাবে। আর একই ধরনের সহিংসতায় যদি কেউ স্থায়ীভাবে নিজের কার্যক্ষমতা বা অঙ্গ হারান তবে ৪ লাখ টাকা, সাময়িকভাবে গুরুতর জখম হলে ২ লাখ টাকা এবং সাধারণ আঘাতের ক্ষেত্রে জখমের গভীরতা বুঝে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা সাহায্য দেওয়া হবে।

দ্বিতীয় ক্যাটাগরি অনুযায়ী, নির্বাচনের ডিউটিতে থাকা অবস্থায় কোনো কর্মী যদি আকস্মিকভাবে হৃদরোগ বা অন্য কোনো জটিলতায় ভোগেন কিংবা মারা যান, তবে তাঁর পরিবার এককালীন ৬ লাখ টাকা পাবে। এ ছাড়া অন-ডিউটি গুরুতর অসুস্থতা বা স্থায়ী পঙ্গুত্বের জন্য ৩ লাখ টাকা, সাময়িক অসুস্থতায় ৫০ হাজার টাকা, হাসপাতালে থেকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল চিকিৎসা করালে ৩ লাখ টাকা এবং সাধারণ চিকিৎসায় হাসপাতালে ভর্তি থাকলে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত নগদ আর্থিক অনুদান পাওয়ার স্পষ্ট আইনি সুযোগ রয়েছে।

টাকা বণ্টনের ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ সরকারি কর্মচারী পেনশন সহজীকরণ নির্দেশিকাকে মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হবে। কোনো মৃত কর্মীর একাধিক স্ত্রী থাকলে অনুদানের অর্থ তাঁদের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করা হবে, তবে এক্ষেত্রে স্ত্রীদের যৌথভাবে আবেদন করা বাধ্যতামূলক। 

আরেকটি বিশেষ শর্ত হলো, অনুদান হস্তান্তরের আগে যদি স্বামী বা স্ত্রী পুনরায় নতুন করে বিয়ে করেন, তবে তিনি এই সরকারি সুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা হারাবেন। মৃত ব্যক্তির স্বামী বা স্ত্রী জীবিত না থাকলে অনূর্ধ্ব ২৫ বছর বয়সী ছেলে বা অবিবাহিত মেয়ে এবং কোনো সন্তান না থাকলে পিতা-মাতা এই অনুদানের জন্য মনোনীত হবেন। নাবালক সন্তানদের ক্ষেত্রে অভিভাবকত্ব নির্ধারণে ১৯৮৫ সালের পারিবারিক আদালত অর্ডিন্যান্সের আইন মেনে চলা হবে। অবিবাহিত কর্মীদের ক্ষেত্রে বাবা-মা বা ভাই-বোন এই টাকা পাবেন। যদি কোনো প্রথম সারির বৈধ উত্তরাধিকারী না থাকে, তবে বিবাহিত মেয়েরাও উপযুক্ত প্রমাণপত্র প্রদর্শন করে এই তহবিলের জন্য আবেদন জানাতে পারবেন।

এই আর্থিক সহায়তা পাওয়ার জন্য দুর্ঘটনা ঘটার বা অসুস্থ হওয়ার পরবর্তী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করে রিটার্নিং অফিসার বা সংশ্লিষ্ট অফিস প্রধানের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব বা সচিব বরাবর আবেদনপত্র জমা দিতে হবে। আবেদনের সাথে আবেদনকারীর সত্যায়িত ছবি, উত্তরাধিকার সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং সিভিল সার্জন বা সরকারি মেডিকেল বোর্ডের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের দেওয়া ডেথ সার্টিফিকেট বা মেডিকেল রিপোর্ট সংযুক্ত করতে হবে।

আগত আবেদনগুলো নিখুঁতভাবে যাচাই করার জন্য নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের নির্বাচন ব্যবস্থাপনা-১ উইংয়ের যুগ্মসচিবকে প্রধান এবং বাজেট ও অর্থ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিবকে সদস্য সচিব করে একটি ৫ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের স্ক্রিনিং বা যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করা হয়েছে। 

এই বিশেষ কমিটি প্রতি অর্থ বছরে অন্তত দুইবার বৈঠক করে আবেদনসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করবে এবং অনুদানের সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করে সচিবের কাছে ফাইল পেশ করবে। পরবর্তীতে কমিশনের চূড়ান্ত সই ও অনুমোদনের পর সরাসরি সুবিধাভোগীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অনলাইনের মাধ্যমে এককালীন এই অনুদানের পুরো অর্থ পাঠিয়ে দেওয়া হবে। প্রতি অর্থ বছরের মূল বাজেটে এই জনকল্যাণমূলক খাতের জন্য আলাদা ফান্ড বরাদ্দ রাখবে নির্বাচন কমিশন।

এএন