বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে অন্যতম চ্যালেঞ্জিং এবং গুরুত্বপূর্ণ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বহুল আলোচিত গণভোটকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী মাঠ এখন সরগরম। নির্বাচন কমিশন (ইসি) এবারের নির্বাচনকে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে স্বচ্ছ ও বিতর্কমুক্ত রাখার অঙ্গীকার করেছে। প্রচার-প্রচারণা যত গতিশীল হচ্ছে, আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনাও তত সামনে আসছে। এরই প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার নির্বাচনী মাঠের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তিনি জানান, প্রচার-প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত সারাদেশে ১২৮টি নির্বাচনী এলাকায় মোট ১৪৪টি আচরণবিধি ভঙ্গের ঘটনা চিহ্নিত করা হয়েছে।
এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কমিশনের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। কমিশনারের দেওয়া তথ্যমতে:
মামলার সংখ্যা: গুরুতর আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে এখন পর্যন্ত ৯৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
জরিমানা আদায়: ভ্রাম্যমাণ আদালত ও কমিশনের সরাসরি হস্তক্ষেপে এ পর্যন্ত মোট ৯ লাখ ৫ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জোর দিয়ে বলেন, নির্বাচনী মাঠ এখন পর্যন্ত অত্যন্ত স্বচ্ছ রয়েছে। আমরা প্রতিটি অভিযোগ খতিয়ে দেখছি এবং আইন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছি। ভোটারদের আস্থা ফেরাতে ইসি বদ্ধপরিকর।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি দেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ গণভোটও অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই দ্বৈত নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ইসি পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছে, নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী গণভোটের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিতে পারবেন না।
কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, "নির্বাচনী দায়িত্বে যারা থাকবেন, তারা গণভোটের কোনো পক্ষ নিতে পারবেন না। এটি একটি আইনি বাধ্যবাধকতা। আমাদের লক্ষ্য কেবল সুষ্ঠুভাবে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন করা।" তবে সরকারের পক্ষ থেকে গণভোটের প্রচারণা চালানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি, যা কমিশনের স্বাধীন সত্তা বজায় রাখার একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এবারের নির্বাচনের অন্যতম মাইলফলক হলো প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার প্রয়োগে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার। 'পোস্টাল ভোট বিডি' মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে প্রবাসীরা যেভাবে সাড়া দিচ্ছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে আগে কখনও দেখা যায়নি।
প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন বিষয়ক ‘ওসিভি-এসডিআই’ প্রকল্পের টিম লিডার সালীম আহমাদ খান প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ২৭ জানুয়ারি সকাল পর্যন্ত পরিসংখ্যান নিম্নরূপ:
মোট নিবন্ধন: দেশ ও বিদেশ মিলিয়ে মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটের জন্য নিবন্ধন করেছেন।
প্রবাসী নিবন্ধন: এর মধ্যে প্রবাসী ভোটারের সংখ্যা ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬২ জন।
ব্যালট গ্রহণ: ইতোমধ্যে ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৯২০ জন প্রবাসী তাদের ব্যালট হাতে পেয়েছেন।
ভোট প্রদান সম্পন্ন: ৪ লাখ ২৫ হাজার ৭৮৮ জন প্রবাসী ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।
বাংলাদেশে ব্যালট প্রেরণ: ২১ হাজার ৫০৮ জন প্রবাসীর দেওয়া ব্যালট ইতোমধ্যে বাংলাদেশে পৌঁছেছে।
এই ডিজিটাল পদ্ধতি প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করেছে এবং জাতীয় নির্বাচনে তাদের সরাসরি অংশগ্রহণের পথ সুগম করেছে।
অতীতের নির্বাচনগুলো নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে অনীহা বা শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, ইসি তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। আনোয়ারুল ইসলাম সরকার আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, ভোটাররা শতভাগ আস্থা নিয়ে এবার কেন্দ্রে আসবেন। তিনি বিশ্বাস করেন, এবারের নির্বাচন ঘিরে সব ধরনের নেতিবাচক আশঙ্কা কাটিয়ে ইসি একটি সফল এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে সক্ষম হবে।
নির্বাচন কমিশনের এই দাবি কতটুকু বাস্তবসম্মত, তা বোঝা যাবে ভোটের দিন। তবে আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে দ্রুত মামলা ও জরিমানা আদায়ের প্রবণতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইসি এবার মাঠ প্রশাসনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় মরিয়া।
নির্বাচন কমিশনার তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন যে, কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সরকারের কোনো কাজের সমালোচনা করা তাদের কাজ নয়, বরং তাদের কাজ হলো নির্বাচনী আইন ও সংবিধানের বাস্তবায়ন করা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কমিশনের এই 'ব্যালান্সিং অ্যাক্ট' বা ভারসাম্যমূলক অবস্থান নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের তৎপরতা বর্তমানে দৃশ্যমান। একদিকে প্রযুক্তির ব্যবহার করে প্রবাসীদের সম্পৃক্ত করা, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে আচরণবিধি রক্ষায় কড়াকড়ি—এই দুই ফ্রন্টে ইসি কাজ করছে। তবে মূল চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমতা বজায় রাখা এবং ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে আসার পরিবেশ নিশ্চিত করা। প্রবাসীদের মধ্যে ভোটের যে জোয়ার দেখা যাচ্ছে, তা যদি দেশের অভ্যন্তরেও প্রতিফলিত হয়, তবে এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি নতুন অধ্যায় হতে পারে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন