ভোটে নারীদের নিরাপদ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৬, ০৪:২৫ পিএম
ভোটে নারীদের নিরাপদ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের আহ্বান
সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে কালকের দিনটি (১২ ফেব্রুয়ারি) একটি বড় মাইলফলক হতে যাচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গণভোটকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যখন টানটান উত্তেজনা, ঠিক তখনই এক বিশেষ বার্তায় সরব হয়েছে বাংলাদেশে নিযুক্ত জাতিসংঘ কার্যালয়। বিশ্বসংস্থাটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে—নির্বাচন তখনই সার্থক হবে, যখন সেখানে নারীদের 'নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অর্থপূর্ণ' অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে।

বুধবার দুপুরে জাতিসংঘের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই আহ্বান জানানো হয়। বিবৃতিতে কেবল সাধারণ নারী ভোটারই নয়, বরং সংখ্যালঘু, প্রতিবন্ধী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।

জাতিসংঘ মনে করে, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা কেবল একটি নাগরিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি মৌলিক মানবাধিকার। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের পূর্বশর্ত হলো সমাজের সকল স্তরের মানুষের সমান সুযোগ। বিশেষ করে যারা শারীরিক প্রতিবন্ধকতা বা সামাজিক বৈষম্যের শিকার, সেই সব নারীদের জন্য ভোটকেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছানোর পথ সুগম করা রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলোর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

জাতিসংঘের ভাষায়, "নিরাপদ ও অর্থবহ অংশগ্রহণ সবার মৌলিক অধিকার। এর মধ্যে ভিন্ন লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষ এবং সমাজে যারা লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকেন, তাদের অধিকারও সমানভাবে সংরক্ষিত থাকতে হবে।"

এবারের নির্বাচনে বড় একটি আশঙ্কার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। নাগরিক সমাজ এবং নারী অধিকার কর্মীদের দীর্ঘদিনের উদ্বেগের সঙ্গে একমত পোষণ করে জাতিসংঘ জানিয়েছে, নারী প্রার্থী ও ভোটারদের লক্ষ্য করে অনলাইনে পরিকল্পিতভাবে হয়রানি চালানো হচ্ছে।

বিবৃতিতে বর্তমান সময়ের আধুনিক প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জগুলো ফুটে উঠেছে সাইবার বুলিং। নারী রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে ব্যক্তিগত আক্রমণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে নারীদের অশোভন বা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কনটেন্ট তৈরি করা। নারী প্রার্থীদের ইমেজ নষ্ট করতে ভিত্তিহীন গুজব ছড়ানো।

জাতিসংঘের মতে, এই ধরনের কর্মকাণ্ড কেবল নারীদের আত্মবিশ্বাসই নষ্ট করে না, বরং যোগ্য নারী নেতৃত্বকে রাজনীতি থেকে পিছিয়ে দেয়।

বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশন (ইসি) যাতে নারীবান্ধব নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি করতে পারে, সে লক্ষ্যে জাতিসংঘ ধারাবাহিকভাবে কারিগরি ও পরামর্শমূলক সহায়তা দিয়ে আসছে। সংস্থাটি মনে করে, নারীরা যখন ভোটার বা প্রার্থী হিসেবে কোনো ভয়ভীতি বা প্রতিশোধের আশঙ্কা ছাড়াই মাঠে থাকতে পারবেন, তখনই একটি গণতন্ত্র পূর্ণতা পাবে।

নির্বাচন কমিশনকে লক্ষ্য করে জাতিসংঘ বলেছে, ভোটারদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং অনলাইনে যারা নির্বাচনকেন্দ্রিক অপরাধ করছে, তাদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।

নির্বাচনী মাঠে লড়াইটা মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে হয়। তাই জাতিসংঘের আহ্বানটি সরাসরি রাজনৈতিক নেতাদের উদ্দেশ্যেও ছিল। 

সংস্থাটি সকল রাজনৈতিক দল ও তাদের সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন কোনো নারী প্রার্থীর বিরুদ্ধে কুৎসিত বা লিঙ্গবিদ্বেষী স্লোগান ব্যবহার না করা হয়। নারী কর্মীদের প্রচারাভিযানে শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা দেওয়া হয়। নারীদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কেবল কাগজে-কলমে না রেখে মাঠ পর্যায়ে কার্যকর করা হয়।

জাতিসংঘের এই বার্তায় বাংলাদেশ সরকারের প্রতি এক ধরনের আস্থার বহিঃপ্রকাশও দেখা গেছে। সংস্থাটি বিশ্বাস করে, বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ দেশের নিরাপত্তা ও আইনের শাসন বজায় রাখতে সক্ষম হবে। বিশেষ করে নির্বাচনের দিন এবং পরবর্তী সময়ে নারীরা যাতে কোনো ধরণের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার না হন, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে বলা হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "জাতিসংঘ সবসময় সরকারের পাশে থেকে সহায়তা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যাতে প্রতিটি নাগরিকের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত হয়।

বাংলাদেশের মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী। তা সত্ত্বেও সংসদীয় আসনগুলোতে সরাসরি নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের সংখ্যা এখনো আশানুরূপ নয়। এর পেছনে বড় কারণ হলো রাজনৈতিক সহিংসতা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে প্রযুক্তির দাপট বাড়ায় 'ডিজিটাল সহিংসতা' একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। জাতিসংঘের এই সময়োপযোগী হস্তক্ষেপ মূলত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সেই উদ্বেগেরই প্রতিফলন, যা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অপরিহার্য।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই শুরু হবে ভোটগ্রহণ। একদিকে গণভোট, অন্যদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন—এই দ্বিমুখী কর্মযজ্ঞে নারীদের দীর্ঘ লাইন ভোটকেন্দ্রে দেখা যাবে কি না, তা নির্ভর করছে আজকের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর। মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি বলছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

পরিশেষে, জাতিসংঘের এই আহ্বান কেবল একটি বিবৃতি নয়, বরং এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য দিকনির্দেশনা। একটি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে ভয়ের চাদরে রেখে প্রকৃত গণতন্ত্র চর্চা অসম্ভব। কালকের নির্বাচনে নারীদের নির্ভয় পদচারণা কি দেখা যাবে? সেই উত্তরের অপেক্ষায় এখন পুরো দেশ।

এএন