ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। দেশজুড়ে যখন টানটান উত্তেজনা, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে নিজের দৃঢ় অবস্থানের কথা জানান দিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। পূর্বসূরিদের কারাবরণ কিংবা ব্যর্থতার গ্লানি তাঁকে স্পর্শ করছে না—এমন ইঙ্গিত দিয়ে তিনি জানিয়েছেন, আইনের পথে থাকলে ভয়ের কোনো কারণ নেই।
ভোটের আগের দিন বুধবার রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত হলো বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য বিশেষ ব্রিফিং। সেখানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সামনে উঠে এল এক অস্বস্তিকর কিন্তু বাস্তবমুখী প্রশ্ন।
জবাবে আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে সিইসি বলেন, "অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে আমরা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও আইনকানুনের মধ্যেই কাজ করছি। যেহেতু আমরা আমাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বা 'কমিটমেন্ট' অনুযায়ী এগোচ্ছি, তাই আমাদের ভয়ের কোনো কারণ নেই।"
সিইসি নাসির উদ্দিন তাঁর বক্তব্যে বারবার 'স্বচ্ছতা' শব্দটির ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করে বলেন, নির্বাচন কমিশন তার যাত্রার শুরু থেকেই প্রতিটি পদক্ষেপ জনসমক্ষে উন্মুক্ত রেখেছে। সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিই হবে এই নির্বাচনের স্বচ্ছতার সবচেয়ে বড় গ্যারান্টি। তিনি বিশ্বাস করেন, কোনো বিচ্যুতি থাকলে তা সাংবাদিকদের মাধ্যমেই উঠে আসবে, যা কমিশনকে আরও সতর্ক করবে।
এবারের নির্বাচনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অভূতপূর্ব আগ্রহের চিত্র ফুটে উঠেছে সিইসি-র পরিসংখ্যানে। তিনি জানান, বিশ্বের ৪৫টি দেশ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা এই নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্ত আছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২২০ জনসহ মোট ৩৩০ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন। ১৬০ জনের বেশি বিদেশি সাংবাদিক স্বতন্ত্রভাবে এই নির্বাচন কাভার করছেন। ৮১টি নিবন্ধিত সংস্থার প্রায় ৪৫ হাজার পর্যবেক্ষক এবং ৬০ হাজারের বেশি সাংবাদিক নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহে নিয়োজিত থাকছেন।
নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নাতীত করতে সিইসি ভোট গ্রহণ ও গণনার একটি স্বচ্ছ রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি নিশ্চিত করেন যে, ভোট গ্রহণ শেষে কেন্দ্রেই প্রিসাইডিং কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে গণনা সম্পন্ন হবে।
প্রার্থী বা তাঁদের এজেন্ট, অনুমোদিত পর্যবেক্ষক এবং সাংবাদিকদের উপস্থিতিতেই গণনা কাজ চলবে। গণনা শেষে তাৎক্ষণিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করা হবে এবং পরে রিটার্নিং কর্মকর্তারা তা চূড়ান্তভাবে সংকলন করবেন।
সিইসি বলেন, ভোটারদের গোপনীয়তা রক্ষা করে সাংবাদিকদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। লিঙ্গ, বয়স বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে প্রতিটি ভোটার যাতে কোনো প্রকার ভয়ভীতি ছাড়া কেন্দ্রে আসতে পারেন, সে লক্ষ্যে সরকারি দপ্তরগুলোর সাথে সমন্বয় করে দেশব্যাপী সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আগের দুই নির্বাচন কমিশনারের কারাবাসের প্রসঙ্গটি ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তবে সিইসি নাসির উদ্দিন অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে তা এড়িয়ে না গিয়ে বরং নিজের নৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তাঁর মতে, সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা পালন করলে এবং জাতির কাছে দেওয়া ওয়াদা রক্ষা করলে যেকোনো প্রতিকূলতা জয় করা সম্ভব। তিনি মনে করেন, এবারের নির্বাচনটি কেবল একটি রুটিন কাজ নয়, বরং গণতান্ত্রিক আস্থা পুনরুদ্ধারের একটি বড় পরীক্ষা।
বিদেশি পর্যবেক্ষকদের সামনে সিইসি-র এই বক্তব্য কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ব্রিফিং নয়, এটি বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর আন্তর্জাতিক আস্থা ফিরিয়ে আনার একটি প্রচেষ্টা। এখন দেখার বিষয়, কালকের সূর্যোদয়ের সাথে সাথে ব্যালট পেপারে এই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন কতটা ঘটে। সিইসি-র 'নির্ভয়' অবস্থান কি সাধারণ ভোটারদের মাঝেও সেই একই সাহস জোগাতে পারবে? সেই উত্তর মিলবে আগামীকাল সন্ধ্যায়।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন