আজকের দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। দীর্ঘ সময় পর একটি অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের সাক্ষী হতে যাচ্ছে দেশ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদের ওপর ভিত্তি করে অনুষ্ঠিত সাংবিধানিক গণভোটকে কেন্দ্র করে সারা দেশে বিরাজ করছে এক অভূতপূর্ব নির্বাচনী আমেজ।
ভোরের আলো ফোটার আগেই রাজধানীসহ সারা দেশের ভোটকেন্দ্রগুলোতে শুরু হয়েছে ভোটারদের আনাগোনা। কুয়াশাভেজা শীতের সকাল উপেক্ষা করে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েছেন তরুণ থেকে বৃদ্ধ, সবাই। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হওয়া এই মহাযজ্ঞ চলবে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, দীর্ঘ ১৮ মাস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনের পর আজ দেশের ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি ভোটার তাদের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের সুযোগ পাচ্ছেন।
রাজধানীর মিরপুর, বনানী, উত্তরা এবং পুরান ঢাকার বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, ভোট শুরুর অন্তত এক ঘণ্টা আগে থেকেই মানুষ লাইনে দাঁড়িয়েছেন। বিশেষ করে প্রথমবার ভোট দিতে আসা তরুণ ভোটারদের মধ্যে দেখা গেছে ব্যাপক উৎসাহ।
উত্তরার একটি কেন্দ্রের সামনে লাইনে দাঁড়ানো শিক্ষার্থী ফাহিম আহমেদ বলেন, আমি প্রথমবার জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিচ্ছি, নিজের পছন্দের প্রতিনিধি বাছাই করতে পেরে খুব ভালো লাগছে। আমরা চাই একটি দুর্নীতিমুক্ত এবং কর্মসংস্থানবান্ধব সরকার। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সারা দেশে মোতায়েন করা হয়েছে প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। এর মধ্যে ১ লাখের বেশি সেনা সদস্য বিশেষ আক্রমণাত্মক দল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বুধবারই দেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স ও নির্বাচনী সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। রাতভর কেন্দ্রগুলো পাহারা দিয়েছে পুলিশ, আনসার ও যৌথ বাহিনী।
এবারের নির্বাচন অনেকগুলো কারণেই ব্যতিক্রম। ৫০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল এই লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছে। মোট সংসদীয় আসন ৩০০টি হলেও ভোট হচ্ছে ২৯৯টিতে। মোট প্রার্থী ২ হাজার ২৮ জন যার মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। নারী প্রার্থীর সংখ্যা এবার ৮৩ জন যার মধ্যে দলীয় ৬৩ ও স্বতন্ত্র ২০ জন। শেরপুর-৩ আসনে প্রার্থীর মৃত্যুজনিত কারণে ভোট স্থগিত রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য এবারই প্রথম নারী প্রার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যদিও তা মোট প্রার্থীর তুলনায় এখনো কম অর্থাৎ মাত্র ৩.৫ শতাংশ, তবুও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো সাধারণ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই সনদ এর ওপর একটি সাংবিধানিক গণভোট। ভোটাররা একই সাথে সংসদ সদস্য নির্বাচন করছেন এবং দেশের ভবিষ্যৎ শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর সংস্কার প্রস্তাবের ওপর নিজেদের মতামত হ্যাঁ অথবা না দিচ্ছেন।
সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রভাবশালী প্রার্থীদের ভোট দিতে দেখা গেছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান, জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম ইতিমধ্যে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। প্রত্যেকেই জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন এবং ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। দীর্ঘ সময় পর সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ নির্বাচন হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার জায়গা তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনারদের ধারণা, দিনশেষে ভোটার উপস্থিতির হার ৫৫ থেকে ৬৫ শতাংশ হতে পারে। গণতন্ত্রের চাকা সচল করতে আজ ব্যালট যুদ্ধে নেমেছে বাংলাদেশ। দেশের ২৯৯টি আসনে কে হাসবেন শেষ হাসি, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আগামীকাল সকাল পর্যন্ত। তবে ফলাফল যা-ই হোক, ভোটারদের এই স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের মানুষ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কতটা শ্রদ্ধাশীল। বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ শেষে শুরু হবে গণনা। পুরো জাতি এখন তাকিয়ে আছে একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য ফলাফলের দিকে।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন