রাজধানীর ভোটের চিত্র: গড় উপস্থিতির চেয়ে পিছিয়ে ঢাকা

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬, ০৪:২৩ পিএম
রাজধানীর ভোটের চিত্র: গড় উপস্থিতির চেয়ে পিছিয়ে ঢাকা

রাজধানী ঢাকার রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম হলেও সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজধানীর ভোটারদের উপস্থিতিতে এক ধরণের নির্লিপ্ততা দেখা গেছে। নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে গড় ভোটের হার যেখানে ৫৯.৪৪ শতাংশ, সেখানে ঢাকার ১৫টি আসনের কোনোটিতেই অর্ধেকের বেশি ভোটার কেন্দ্রে যাননি।

ঢাকার রাজপথ রাজনৈতিক আন্দোলনে উত্তাল থাকলেও ব্যালট বাক্সে সেই উত্তাপের প্রতিফলন পুরোটা দেখা যায়নি। 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজধানীর ১৫টি সংসদীয় আসনের (ঢাকা-৪ থেকে ঢাকা-১৮) ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভোটারদের উপস্থিতির হার জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশ কম। ১৫টি আসনের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোট পড়েছে ঢাকা-৫ আসনে এবং সর্বনিম্ন হার রেকর্ড করা হয়েছে ঢাকা-১২ আসনে।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, ডেমরা ও দনিয়া এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-৫ আসন ভোটের হারের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে। এই আসনে ৪৮.৭৫ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ কামাল হোসেন ৯৬,৬৪১ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন, যা তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মো. নবী উল্লা (৮৭,৪৯১ ভোট) থেকে প্রায় ৯ হাজার বেশি।

অন্যদিকে, রাজধানীর সবচেয়ে অভিজাত ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা তেজগাঁও ও শেরেবাংলা নগর নিয়ে গঠিত ঢাকা-১২ আসনে ভোটারদের অনাগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। মাত্র ৩৭.৪২ শতাংশ ভোট নিয়ে এটি রাজধানীর সর্বনিম্ন উপস্থিতির আসনে পরিণত হয়েছে। এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর সাইফুল আলম (মিলন) ৫৩,৭৭৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তবে এখানে ভোট ভাগাভাগির এক নাটকীয় সমীকরণ দেখা গেছে, যেখানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সাইফুল আলম নীরব এবং ১১-দলীয় ঐক্যের সাইফুল হক মিলে বড় অংকের ভোট কাটতে সক্ষম হয়েছেন।

ভোটের হারের চেয়ে জয়ের ব্যবধান দিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছেন খিলগাঁও-সবুজবাগ এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-৯ আসনের বিএনপি প্রার্থী হাবিবুর রশিদ। তিনি তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এনসিপি-র জাবেদ মিয়ার চেয়ে ৫৭,৭৫২ ভোট বেশি পেয়ে রাজধানীর মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করেছেন। উল্লেখ্য, এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াই করা আলোচিত চিকিৎসক তাসনিম জারা ৪৪,৬৮৪ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থান দখল করেছেন।

রাজধানীর আসনগুলোর মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়ার রেকর্ড গড়েছেন ঢাকা-১৮ (উত্তরা) আসনের বিএনপি প্রার্থী এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি পেয়েছেন ১,৪৪,৭১৫ ভোট। বিপরীতে, রাজধানীর হেভিওয়েট নেতা বিএনপির মির্জা আব্বাস ঢাকা-৮ (মতিঝিল-পল্টন) আসন থেকে জয়ী হলেও তাঁর প্রাপ্ত ভোট ৫৯,৩৬৬, যা রাজধানীর আসনগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন বিজয়সূচক ভোট।

রাজধানীর লড়াইয়ে সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ ছিল ঢাকা-১১ (বাড্ডা-ভাটারা) আসন। এখানে এনসিপি-র আহ্বায়ক এবং ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী নাহিদ ইসলাম অত্যন্ত স্বল্প ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ৯৩,৮৭২ ভোট, যেখানে বিএনপির হেভিওয়েট নেতা এম এ কাইয়ুম পেয়েছেন ৯১,৮৩৩ ভোট। মাত্র ২,০৩৯ ভোটের ব্যবধানে নির্ধারিত হয়েছে এই আসনের ভাগ্য, যা রাজধানীর ১৫টি আসনের মধ্যে ক্ষুদ্রতম ব্যবধান।

জাতীয় গড়ের চেয়ে ঢাকার ভোটের হার কম হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বেশ কিছু কারণ দেখছেন। প্রথমত, রাজধানীর ভোটারদের একটি বড় অংশ ভাসমান বা চাকুরিজীবী, যারা ছুটির দিনে ভোট দেওয়ার চেয়ে বিশ্রামে বা গ্রামে যাওয়াকে প্রাধান্য দেন। দ্বিতীয়ত, অনেক আসনে বড় দলগুলোর হেভিওয়েট প্রার্থী না থাকা বা বিদ্রোহীদের কারণে ভোটারদের মধ্যে কিছুটা দ্বিধা কাজ করেছে। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, রাজধানীর ১৫টি আসনের মধ্যে ঢাকা-৭ (৪৮.১৬%) এবং ঢাকা-৬ (৪৭.৬৯%) আসন দুটি ভোটের হারে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে থেকে মোটামুটি লড়াইয়ের আভাস দিয়েছে।

এএন