বাংলাদেশে গরমকাল ও বর্ষাকালে সবচেয়ে বেশি যে রোগটি মানুষকে ভোগায়, তার মধ্যে অন্যতম হলো ডায়রিয়া। এটি এমন একটি রোগ, যেখানে শরীর থেকে প্রচুর পানি ও লবণ বের হয়ে যায়, ফলে শরীর দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে।
সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে মারাত্মক পানিশূন্যতা (ডিহাইড্রেশন) এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে। তাই ডায়রিয়া দেখা দিলে ঘাবড়ে না গিয়ে তাৎক্ষণিক করণীয় জানা ও প্রয়োগ করা জরুরি।
ডায়রিয়া মানে হলো বারবার পাতলা পায়খানা হওয়া, সাধারণত দিনে তিনবারের বেশি। এতে শরীর থেকে পানি ও প্রয়োজনীয় লবণ বের হয়ে যায়।
ডায়রিয়ার সাধারণ কারণসমূহ: দূষিত খাবার বা পানি গ্রহণ, ভাইরাস (যেমন রোটাভাইরাস), ব্যাকটেরিয়া বা পরজীবী সংক্রমণ, অপরিষ্কার হাত বা খাদ্যদ্রব্য, অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত খাবার খাওয়া, হজমের সমস্যা বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।
ডায়রিয়ার প্রধান লক্ষণ: ঘন ঘন পাতলা পায়খানা হওয়া, বমি বমি ভাব বা বমি, পেট ব্যথা বা গড়গড় শব্দ, জ্বর বা দুর্বল লাগা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, প্রস্রাব কমে যাওয়া, শিশুদের ক্ষেত্রে চোখ বসে যাওয়া ও কান্নায় অশ্রু না আসা।
তাৎক্ষণিক করণীয়: ডায়রিয়া হলে প্রথম কাজ হলো শরীরের পানিশূন্যতা রোধ করা। কারণ, ডায়রিয়া রোগীর মৃত্যুর প্রধান কারণই হলো পানিশূন্যতা।
ওরস্যালাইন (ORS) খাওয়ান: বাজারে পাওয়া ওরস্যালাইন প্যাকেট এক লিটার পানিতে মিশিয়ে খাওয়াতে হবে। প্রতিবার পায়খানার পর অন্তত আধা কাপ থেকে এক কাপ পর্যন্ত ওরস্যালাইন দিন। শিশুদের ক্ষেত্রে চামচে করে অল্প অল্প করে খাওয়াতে হবে।
ঘরে তৈরি ওরস্যালাইন (যদি প্যাকেট না থাকে): এক লিটার বিশুদ্ধ পানিতে ৬ চা চামচ চিনি ও আধা চা চামচ লবণ মিশিয়ে দিন। ভালোভাবে নাড়ুন, এবং পানির স্বাদ যেন হালকা লবণাক্ত হয়।
প্রচুর বিশুদ্ধ পানি পান করুন: স্যালাইনের পাশাপাশি নারকেলের পানি, ভাতের মাড়, ডাবের পানি, পাতলা স্যুপ এগুলো দারুণ কার্যকর।
বিশ্রাম নিন: শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, তাই পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া জরুরি।
দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার এড়িয়ে চলুন: সাময়িকভাবে দুধে হজম সমস্যা বাড়তে পারে।
হালকা খাবার খান: ভাত, আলু, ডাবের পানি, কলা, পাউরুটি ইত্যাদি হালকা ও সহজপাচ্য খাবার গ্রহণ করুন।
ঘরোয়া চিকিৎসা ও উপায়
ডায়রিয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে নিচের ঘরোয়া উপায়গুলো অত্যন্ত কার্যকর
কাঁচা কলা ও ভাতের মাড়: সিদ্ধ কাঁচা কলা ও ভাতের মাড় একসাথে খেলে মল শক্ত হয় ও পানি ক্ষয় রোধ হয়।
দই ও চিড়া: দইয়ের প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া পেটের ভালো জীবাণু বাড়িয়ে হজমে সহায়তা করে।
পাতিলেবুর পানি: পাতিলেবু জীবাণুনাশক হিসেবে কাজ করে। এক গ্লাস গরম পানিতে কয়েক ফোঁটা লেবুর রস মিশিয়ে খেলে আরাম পাওয়া যায়।
আদার রস: এক চা চামচ আদার রসের সঙ্গে সামান্য মধু মিশিয়ে দিনে দুইবার খেলে পেটের গ্যাস ও ডায়রিয়া কমে।
মেথি দানার পানি: এক চা চামচ মেথি দানা পানিতে ভিজিয়ে রেখে সেই পানি খেলে পেটের ক্র্যাম্প ও পাতলা পায়খানা কমে যায়।
কাঁচা পেঁপে: সিদ্ধ কাঁচা পেঁপে পেটের ব্যাকটেরিয়া দমন করে হজমে সাহায্য করে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
ডায়রিয়া সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যেই সেরে যায়। তবে নিচের অবস্থাগুলিতে তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি
- ৩ দিনের বেশি সময় ধরে পাতলা পায়খানা চললে
- বমি থামছে না
- রক্তমিশ্রিত পায়খানা
- শিশুর প্রস্রাব বন্ধ বা খুব কম হওয়া
- অত্যধিক দুর্বলতা, চোখ বসে যাওয়া
- জ্বর বা পেট ফেঁপে থাকা
- শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য বিশেষ সতর্কতা
- শিশু ও বৃদ্ধদের শরীরে পানির ঘাটতি দ্রুত হয়
- ওরস্যালাইন প্রতি ১৫–২০ মিনিট অন্তর অল্প অল্প করে খাওয়ান
- বুকের দুধপানরত শিশুদের বুকের দুধ বন্ধ করবেন না
- শিশুকে ডাবের পানি, মাড় বা হালকা খাবার দিন
প্রতিরোধের উপায়
১. বিশুদ্ধ পানি পান করুন ও ফুটানো পানি ব্যবহার করুন।
২. খাওয়ার আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন।
৩. রাস্তার খাবার বা অপরিষ্কার পানি থেকে তৈরি খাবার পরিহার করুন।
৪. খাবার ঢেকে রাখুন যাতে মাছি না বসে।
৫. শিশুকে দুধ খাওয়ানোর আগে হাত পরিষ্কার রাখুন।
ডায়রিয়া এমন একটি রোগ যা অল্প যত্নে ও সময়মতো ব্যবস্থা নিলে দ্রুত সেরে যায়, কিন্তু অবহেলায় তা প্রাণঘাতী হতে পারে। তাই ডায়রিয়া হলে ভয় না পেয়ে প্রথমেই ওরস্যালাইন শুরু করুন, বিশুদ্ধ পানি পান করুন এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান।
মনে রাখবেন ডায়রিয়ার ওষুধ হলো পানি, আর বাঁচার উপায় হলো সচেতনতা।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন