নেফ্রোলজি: কিডনি রোগ এবং প্রতিরোধ-চিকিৎসার করণীয়

হাশেম রেজা প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৬, ২০২৫, ০১:২৭ পিএম
নেফ্রোলজি: কিডনি রোগ এবং প্রতিরোধ-চিকিৎসার করণীয়

নেফ্রোলজি হলো মানবদেহের কিডনির রোগ নিয়ে বিশেষায়িত চিকিৎসা শাখা। সহজ ভাষায় বলতে গেলে- কিডনি, তার কার্যকারিতা, কিডনি-সংশ্লিষ্ট রোগ, ব্যর্থতা, সংক্রমণ, প্রদাহ এবং ডায়ালাইসিস-ট্রান্সপ্লান্ট সংক্রান্ত সব কিছুই নেফ্রোলজির আওতায় পড়ে।

কিডনি আমাদের শরীরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। প্রতিদিন ২০০ লিটার রক্ত ছেঁকে শরীরের বর্জ্য, অতিরিক্ত পানি ও নুন বের করে দেয়, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে, হিমোগ্লোবিন উৎপাদনে সাহায্য করে, এমনকি হাড় শক্ত রাখার জন্য হরমোন তৈরি করে। তাই কিডনির সামান্য সমস্যাও পুরো দেহকে প্রভাবিত করে।

নেফ্রোলজির আওতায় সাধারণত নিম্নোক্ত রোগগুলো পড়ে একিউট কিডনি ইনজুরি (AKI)। হঠাৎ করে কিডনির কার্যকারিতা কমে যাওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া। এটি জরুরি অবস্থা।

  • ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (CKD): ধীরে ধীরে দীর্ঘমেয়াদে কিডনির ক্ষমতা কমে যাওয়া। একে সাধারণভাবে ‘কিডনি বিকল’ বলা হয়। ৫টি ধাপ থাকে ৫ম ধাপে ডায়ালাইসিস বা প্রতিস্থাপন লাগে।
  • নেফ্রাইটিস / গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস: কিডনির ফিল্টার অংশে প্রদাহ তৈরি হওয়া। এতে শরীরে পানি জমে, প্রস্রাব কমে, ফেনাযুক্ত হয়, রক্তের সঙ্গে বের হতে পারে।
  • কিডনিতে পাথর (Kidney Stone): বর্জ্য পদার্থ ও মিনারেল জমে কঠিন পাথর হয়ে কিডনিতে আটকে যায়।
  • ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (UTI): মূত্রনালিতে জীবাণু সংক্রমণ। সঠিক চিকিৎসা না হলে কিডনিতে ছড়িয়ে পাইলোনেফ্রাইটিস তৈরি হতে পারে।
  • নেফ্রোটিক সিন্ড্রোম: কিডনিতে প্রোটিন লিকেজ বেড়ে যাওয়ায় শরীর ফোলা, প্রস্রাবে ফেনা, দুর্বলতা ইত্যাদি দেখা দেয়।
  • ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি: ডায়াবেটিসের কারণে ধীরে ধীরে কিডনির ক্ষতি হওয়া বিশ্বে কিডনি বিকলের সবচেয়ে বড় কারণ।
  • হাইপারটেনসিভ নেফ্রোপ্যাথি: উচ্চ রক্তচাপের কারণে কিডনি দুর্বল হয়ে পড়া।
  • পলিসিস্টিক কিডনি ডিজিজ (PKD): জন্মগত জেনেটিক রোগ, যেখানে কিডনিতে অসংখ্য পানি-ভর্তি সিস্ট তৈরি হয়।
  • ডায়াবেটিস: বিশ্বে কিডনি নষ্ট হওয়ার প্রধানতম কারণ। নিয়ন্ত্রণহীন রক্তে শর্করা কিডনির ক্ষুদ্র রক্তনালী নষ্ট করে।
  • উচ্চ রক্তচাপ: দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত BP কিডনির ফিল্টার ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়।
  • নীরব সংক্রমণ (UTI): বারবার সংক্রমণ হলে কিডনি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
  • পাথর: কিডনিতে বারবার পাথর হলে কিডনি ব্লক বা সংক্রমণ হতে পারে।
  • ব্যথানাশক ওষুধের অপব্যবহার: NSAIDs (ডাইক্লোফেনাক, কেটোরোল্যাক, নাপা এক্সটেন্ড ইত্যাদি) কিডনির উপর অত্যন্ত ক্ষতিকর।
  • কম পানি পান করা: শরীর ডিহাইড্রেটেড হলে কিডনি ঠিকমতো কাজ করতে পারে না।

বেশি লবণ ও প্রোটিন খাওয়া। বংশগত কারণ। বিষাক্ত খাবার/খাদ্যদূষণ, ভেজাল, অতিরিক্ত সোডিয়াম খাবার।

কিডনি রোগ প্রথমদিকে ‘নীরব’ থাকে। মানুষ টের পায় না। কিন্তু পরবর্তীতে- কম প্রস্রাব বা অত্যধিক প্রস্রাব, চোখ-মুখ-পা-গোড়ালি ফোলা, প্রস্রাবে ফেনা বা রক্ত, ক্লান্তি ও দুর্বলতা, রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া, বমি বমি ভাব, ক্ষুধামন্দা, ঘুম না হওয়া, মুখে দুর্গন্ধ, ত্বক শুষ্ক ও চুলকানি, শ্বাসকষ্ট (গুরুতর ক্ষেত্রে) এসব লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে নেফ্রোলজি বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া জরুরি।

কিডনি নষ্ট হয়ে গেলে অনেক সময় আগের মতো ১০০% ফিরিয়ে আনা যায় না। তাই প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় কাজ।

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ (যদি ডায়াবেটিস থাকে): নিয়মিত মাপা, ডাক্তার নির্দেশিত ওষুধ/ইনসুলিন চলা, মিষ্টি, ভাত, রুটি নিয়ন্ত্রিত, পায়ে হাঁটা ৩০ মিনিট প্রতিদিন, ডায়াবেটিস ঠিক থাকলে কিডনি ৭০-৮০% পর্যন্ত সুরক্ষিত থাকে।

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা। লক্ষ্য: BP 120/80 এর কাছাকাছি, লবণ কম খাওয়া, টেনশন কমানো, ব্যায়াম, ডাক্তার নির্দেশিত bp-medicine নিয়মিত।

পর্যাপ্ত পানি পান: প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে কমপক্ষে ২-৩ লিটার (যদি অন্য কোনো রোগ না থাকে)।

ব্যথানাশক ওষুধ অতিরিক্ত খাবেন না: মাথা, কোমর, হাড়-জোড়ার ব্যথায় বারবার NSAID খাওয়া কিডনি ধ্বংস করে। ডাক্তার ছাড়া দীর্ঘদিন কোনো ব্যথানাশক চলবে না।

পাথর প্রতিরোধে করণীয়: লবণ কম, পানি বেশি, কোলা, সফটড্রিংক কমানো অতিরিক্ত মাংস না খাওয়া।

ইউরিন ইনফেকশন হলে দেরি না করা: প্রস্রাব জ্বালা, ঘন ঘন প্রস্রাব হলে দ্রুত চিকিৎসায় যাওয়া পানি বেশি পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা।

সুষম খাদ্যাভ্যাস: শাকসবজি, ফল, ভাত/রুটি সুষমভাবে, অতিরিক্ত লবণ-ঝাল-তেল কমানো লবণ সর্বোচ্চ দিনে ৫ গ্রাম, লাল মাংস কম মাছ/মুরগি বেশি

কিডনি রোগ শনাক্তের জন্য তিনটি পরীক্ষা খুব গুরুত্বপূর্ণ: সিরাম ক্রিয়েটিনিন, ইউরিন R/E, মাইক্রোঅ্যালবুমিন (ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য) প্রতি ৬ মাসে একবার করাই যথেষ্ট।

ধূমপান সম্পূর্ণ বাদ: ধূমপান কিডনির রক্তনালী সংকুচিত করে-যাদের কিডনি দুর্বল তাদের জন্য এটি সরাসরি ক্ষতিকর।

ওজন নিয়ন্ত্রণ: স্থূলতা (Obesity) কিডনি রোগের ঝুঁকি দ্বিগুণ করে। লক্ষ্য BMI: ১৮.৫–২৪.৯।

যাদের অবশ্যই নেফ্রোলজিস্টের কাছে যাওয়া উচিত: ডায়াবেটিস ৫ বছর বা তার বেশি, উচ্চ রক্তচাপ, পরিবারে কিডনি রোগের ইতিহাস, প্রস্রাবে বারবার ইনফেকশন, পাথরের সমস্যা, শরীরে ফোলা, প্রস্রাবে প্রোটিন/রক্ত, ক্রিয়েটিনিন বা ইউরিয়া বেড়ে গেলে

  • নিয়মিত ফলো-আপ: কিডনি রোগ দীর্ঘমেয়াদি। তাই নিয়মিত নেফ্রোলজিস্ট দেখানো জরুরি।
  • খাদ্য নিয়ন্ত্রণ: রোগের স্টেজ অনুযায়ী ডাক্তার প্রোটিন, লবণ, পানি কম–বেশি করতে বলেন।
  • ওষুধ: BP নিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, প্রদাহ কমানোর ওষুধ, প্রোটিন লস নিয়ন্ত্রণের ওষুধ, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ।
  • ডায়ালাইসিস: CKD-৫ হলে কিডনি ৮৫-৯০% অকার্যকর হয়ে যায়। তখন ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হয়।
  • কিডনি প্রতিস্থাপন (Kidney Transplant): যারা উপযুক্ত, তাদের ক্ষেত্রে ট্রান্সপ্লান্ট অত্যন্ত কার্যকর চিকিৎসা।

নেফ্রোলজি মূলত কিডনির রোগ নিয়ে বিশেষ চিকিৎসাবিজ্ঞান। একিউট ইনজুরি থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি কিডনি বিকল, পাথর, সংক্রমণ, প্রদাহ, ডায়ালাইসিস-সবকিছু এর অন্তর্ভুক্ত। কিডনি নীরবে خراب হয়-তাই প্রতিরোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ডায়াবেটিস-রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত পানি পান, ব্যথানাশক কম খাওয়া, স্বাস্থ্যকর জীবনধারা, নিয়মিত পরীক্ষা-এসব মেনে চললে ৭০-৮০% কিডনি রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

কিডনি একবার নষ্ট হলে ফিরে পাওয়া কঠিন-তাই এখনই সচেতন হওয়া জরুরি।

জেএইচআর