মহামারি রূপ নিচ্ছে হাম: ২৪ ঘণ্টায় আরও ৮ শিশুর মৃত্যু 

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: এপ্রিল ১৬, ২০২৬, ০৩:৫৭ পিএম
মহামারি রূপ নিচ্ছে হাম: ২৪ ঘণ্টায় আরও ৮ শিশুর মৃত্যু 
ফাইল ছবি

সারাদেশে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৮টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়িয়ে দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃতদের মধ্যে ২ জন শিশুর মৃত্যু হামের কারণে হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, আর বাকি ৬ জন মারা গেছে এই রোগের তীব্র উপসর্গ নিয়ে। হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীদের ক্রমবর্ধমান চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিন অনুযায়ী, ১৫ এপ্রিল সকাল ৮টা থেকে ১৬ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সারাদেশে নতুন করে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ‘৮১১ জন শিশু।এর মধ্যে সরকারি ল্যাবে পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের পর ‘৯২ জন শিশুর‘শরীরে হামের ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা হয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহের তুলনায় এই আক্রান্ত ও ভর্তির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেশি।

রাজধানীর বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে এখন হাম আক্রান্ত শিশুদের ভিড়। অনেক হাসপাতালেই শিশুদের জন্য নির্ধারিত শয্যা পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় মেঝেতে বা বারান্দায় রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে তীব্র জ্বর, শ্বাসকষ্ট এবং শরীরের লালচে র‍্যাশ নিয়ে আসা রোগীর সংখ্যাই বেশি। অনেক ক্ষেত্রে হামের পরবর্তী জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া দেখা দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে।

জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, হাম সাধারণত টিকা দিয়ে প্রতিরোধযোগ্য রোগ। তবে এবারের সংক্রমণে মৃত্যুর হার এবং তীব্রতা বেশি হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে:

টিকাদানে অনীহা বা গ্যাপ:নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির (EPI) আওতাভুক্ত ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সের এমআর (MR) টিকা নিতে যারা ব্যর্থ হয়েছে, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

পুষ্টিহীনতা:অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় ভাইরাসটি দ্রুত তাদের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আক্রমণ করছে।

দেরিতে চিকিৎসা:গ্রামীণ বা প্রান্তিক পর্যায়ে অনেক অভিভাবক হামকে সাধারণ জ্বর বা 'মায়ের দয়া' মনে করে কবিরাজি বা ঘরোয়া চিকিৎসায় সময়ক্ষেপণ করছেন, যার ফলে শিশু মাল্টি-অর্গান ফেইলর বা তীব্র নিউমোনিয়ার দিকে চলে যাচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের বেশ কিছু এলাকাকে 'হটস্পট' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে যেখানে সংক্রমণের হার গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। অধিদপ্তর থেকে প্রতিটি জেলা সিভিল সার্জনকে বিশেষ নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে। বিশেষ করে দুর্গম এলাকা এবং সিটি কর্পোরেশনগুলোর বস্তি এলাকায় জরুরি টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, আমরা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের মধ্যে যাদের অবস্থা সংকটাপন্ন, তাদের জন্য আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ড এবং জীবন রক্ষাকারী ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়া এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। 

চিকিৎসকদের মতে: যদি আপনার শিশুর ৯ মাস বা ১৫ মাস বয়সের হামের টিকা বাদ পড়ে থাকে, তবে আজই নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করুন। শিশুর উচ্চ জ্বর, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া এবং ৩-৪ দিন পর শরীরে লালচে র‍্যাশ দেখা দিলে কালক্ষেপণ করবেন না। আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখুন এবং তার ব্যবহৃত কাপড় বা থালাবাসন আলাদাভাবে পরিষ্কার করুন। শিশুকে বারবার পানি, ডাবের পানি, বুকের দুধ এবং ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ান। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরণের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করবেন না।

হামের এই বর্তমান প্রকোপ কেবল একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতার ওপরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। গত ২৪ ঘণ্টায় ৮টি শিশুর মৃত্যু একটি কঠোর সতর্কবার্তা। প্রতিটি শিশুর জীবন রক্ষা করতে হলে পাড়ায় পাড়ায় সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। সরকার ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের লাগাম টেনে ধরতে।

এম জি