স্বল্প টাকার এক কিটেই বদলে যেতে পারে হাম মোকাবিলা

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: জুন ২১, ২০২৬, ০৭:১৮ পিএম
স্বল্প টাকার এক কিটেই বদলে যেতে পারে হাম মোকাবিলা

ঢাকার একটি বিশেষায়িত পরীক্ষাগারে হাম শনাক্তের রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছেন এক শিশুর বাবা। সকালে নমুনা দিলেও ফল পেতে লাগবে অন্তত একদিন, খরচ প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা। রাজধানীর বাইরে হলে সময় আরও বেশি। 

অথচ দেশের বিজ্ঞানীরা বলছেন, একই রোগ মাত্র ২০ মিনিটে শনাক্ত করা সম্ভব, খরচও মাত্র ৭০ থেকে ৮০ টাকা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ রেফারেন্স ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল মেজারমেন্ট (বিআরআইসিএম) হাম শনাক্তে দেশীয় প্রযুক্তিনির্ভর একটি আরটি-ল্যাম্প কিট উদ্ভাবন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, কিটটি উৎপাদনের সক্ষমতাও তাদের রয়েছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পরিপূর্ণ প্রস্তাবনা পাঠানো হলেও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত না হওয়ায় উদ্যোগটি এখনো মাঠপর্যায়ে পৌঁছায়নি।

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে হাম সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। সময়মতো শনাক্ত ও বিচ্ছিন্ন করা না গেলে এটি দ্রুত বিস্তার লাভ করে। বর্তমানে রোগ শনাক্তে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় আরটি-পিসিআর পরীক্ষা, যা আন্তর্জাতিকভাবে ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে স্বীকৃত। তবে এ প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজন ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি, আধুনিক পরীক্ষাগার ও দক্ষ জনবল। ফলে দেশের অধিকাংশ উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে এই সুবিধা নেই। নমুনা সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় ল্যাবে পাঠাতে হয়, যার কারণে রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব এবং ব্যয় দুটোই বাড়ে।

এই বাস্তবতায় আরটি-ল্যাম্প প্রযুক্তিকে সম্ভাবনাময় বিকল্প হিসেবে দেখছেন গবেষকরা। আরটি-ল্যাম্প বা রিভার্স ট্রান্সক্রিপশন লুপ-মিডিয়েটেড আইসোথার্মাল অ্যাম্পলিফিকেশন প্রযুক্তির মাধ্যমে ভাইরাসের জেনেটিক উপাদান শনাক্ত করা যায় তুলনামূলক সহজ পদ্ধতিতে। এতে আরটি-পিসিআর এর মতো ব্যয়বহুল থার্মাল সাইক্লারের প্রয়োজন হয় না; সাধারণ তাপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রেই পরীক্ষা সম্পন্ন করা সম্ভব। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও দ্রুত রোগ নির্ণয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিআরআইসিএমের গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, আরটি-পিসিআর পরীক্ষার ফল পেতে সাধারণত কয়েক ঘণ্টা থেকে একদিন সময় লাগে। বিপরীতে আরটি-ল্যাম্প পরীক্ষায় ২০ থেকে ৬০ মিনিটের মধ্যেই ফল পাওয়া সম্ভব। সংবেদনশীলতার ক্ষেত্রেও প্রযুক্তিটি ৯০ থেকে ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর, যা প্রাথমিক রোগ শনাক্তের জন্য যথেষ্ট বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সবচেয়ে বড় আকর্ষণ খরচ। বর্তমানে একটি আরটি-পিসিআর পরীক্ষায় ব্যয় হয় প্রায় ৩ হাজার ৭৫০ থেকে ৪ হাজার টাকা। বিআরআইসিএমের প্রস্তাবিত দেশীয় আরটি-ল্যাম্প কিট ব্যবহার করলে সেই ব্যয় কমে ৭০ থেকে ৮০ টাকায় নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ একজন রোগীর ক্ষেত্রে খরচ কমবে প্রায় ৫০ গুণ।

স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, বৃহৎ পরিসরে এ প্রযুক্তি চালু করা গেলে সরকারের স্বাস্থ্যখাতের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং পরীক্ষার আওতায় আরও বেশি মানুষকে আনা সম্ভব হবে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য রোগ নির্ণয়ের খরচ কমানো বড় ধরনের স্বস্তি এনে দেবে।

এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আমদানিনির্ভর ডায়াগনস্টিক ব্যবস্থার ওপর চাপও কমবে। বর্তমানে বিভিন্ন পরীক্ষার কিট, রিএজেন্ট ও ল্যাব উপকরণের বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা গেলে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। এ বিষয়ে সাবেক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও মাইক্রোবাইলোজিস্ট অধ্যাপক ডা. কে এম শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিদেশি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীলতার ঝুঁকি আমরা দেখেছি। তাই দেশীয় সক্ষমতা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।’

তিনি আরও বলেন, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন। দ্রুত বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, মাঠপর্যায়ের পরীক্ষামূলক ব্যবহার এবং উৎপাদন পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে দেশের মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে।

তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে—প্রযুক্তি প্রস্তুত ও উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেন তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না? সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রশাসনিক অনুমোদন, বাজেট বরাদ্দ ও আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের জটিলতায় প্রস্তাবটি আটকে আছে। কিছু গবেষকের অভিযোগ, অনেক সময় দেশীয় উদ্ভাবনের তুলনায় আমদানিনির্ভর সমাধান বেশি গুরুত্ব পায়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আরটি-ল্যাম্প কোনোভাবেই আরটি-পিসিআর এর পূর্ণ বিকল্প নয়; বরং দ্রুত স্ক্রিনিং ও প্রাথমিক রোগ শনাক্তের কার্যকর মাধ্যম। সন্দেহভাজন রোগীকে দ্রুত শনাক্ত করে পরে প্রয়োজন হলে আরটি-পিসিআর এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা যেতে পারে।

ভাইরোলজিস্ট মোহাম্মদ মামুন আলম বলেন, ‘মহামারি বা প্রাদুর্ভাবের সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত রোগী শনাক্ত করা। আরটি-ল্যাম্প সেই কাজটি অনেক দ্রুত করতে পারে। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এটি বড় পরিবর্তন আনতে সক্ষম।’

একদিকে সাড়ে তিন হাজার টাকার বেশি খরচে একদিন অপেক্ষার পরীক্ষা, অন্যদিকে ৭০ টাকায় ২০ মিনিটে ফলাফল। দেশের বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রযুক্তি তাঁদের হাতে আছে এবং প্রস্তাবনাও জমা দেওয়া হয়েছে। এখন প্রয়োজন দ্রুত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর বাস্তবায়ন। দেশের লাখো শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় কমানোর এই সম্ভাবনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নেয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

জেএইচআর