নিউইয়র্ক সিটির রাজনীতিতে ইতিহাস রচনা করেছেন জোহরান মামদানি। সীমিত তহবিল, কম দলীয় সমর্থন ও অচেনা মুখ-সব বাধা পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রভাবশালী এই শহরের প্রথম মুসলিম মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। তরুণ প্রজন্মের আশার প্রতীক হিসেবে উঠে আসা মামদানি এখন শহরের নতুন নেতৃত্বের মুখ।
প্রচার থেকে জয় পর্যন্ত: মাত্র এক বছর আগেও নিউইয়র্কবাসীর কাছে তাঁর পরিচিতি ছিল সীমিত। কিন্তু নিজস্ব কর্মধারা, বিনয়ী স্বভাব ও প্রগতিশীল ভাবনা দিয়ে অল্প সময়েই ভোটারদের আস্থা অর্জন করেন তিনি। গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী পরিচয় নিয়েও তিনি পিছিয়ে যাননি; বরং জনগণের জন্য বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, গণপরিবহনের প্রসার ও অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাসের মতো প্রতিশ্রুতিতে তিনি জয়ী হন।
জয়ের পর নতুন বাস্তবতা: নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকে একদিকে উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে শুরু হয়েছে বিশ্লেষণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই মামদানির সামনে শুরু হচ্ছে প্রকৃত চ্যালেঞ্জের অধ্যায়। নিউইয়র্কের আর্থিক কাঠামো, রাজনৈতিক ভারসাম্য ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে তাঁর ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না।
ডেমোক্র্যাটদেরই একজন, গভর্নর ক্যাথি হোকুল, কর বৃদ্ধি নিয়ে যে আপত্তি তুলেছেন, তা মামদানির সামাজিক কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ: মামদানির নির্বাচনী প্রচারে বড় ব্যবসা ও অভিজাত শ্রেণিকে তিনি কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। অথচ এই ব্যবসাগুলিই নিউইয়র্ক অর্থনীতির মূল ভিত্তি। শহরের অর্থনৈতিক প্রাণশক্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে গেলে সেই গোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করতেই হবে-যা তাঁর নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্ব ইতোমধ্যেই আলোচনায়। নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প প্রকাশ্যে মামদানিকে আক্রমণ করেছিলেন এবং নিউইয়র্কে তহবিল বন্ধের হুমকিও দিয়েছিলেন। মেয়র পদে বসার পর সেই চাপ আরও বাড়তে পারে।
নীতিনিষ্ঠ কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান: গাজা প্রশ্নে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়ে মামদানি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচিত হয়েছেন। নির্বাচনী সমাবেশে তিনি বলেছিলেন-ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু যদি নিউইয়র্কে আসেন, তবে তাঁকে ‘যুদ্ধাপরাধের’ অভিযোগে গ্রেপ্তার করবেন। এখন মেয়র হিসেবে তাঁর সেই বক্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও আলোচনার জন্ম দেবে।
রাজনীতিতে নতুন, তাই মামদানির বড় সুবিধা হলো তাঁর ‘পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি’। জনতার প্রত্যাশা এখন তাঁর কাঁধে-একদিকে প্রগতিশীল আদর্শ, অন্যদিকে প্রশাসনিক বাস্তবতা। কিভাবে তিনি এই ভারসাম্য বজায় রাখবেন, সেটিই নির্ধারণ করবে তাঁর মেয়াদকালের সাফল্য।
মামদানির জয় শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়-এটি আমেরিকান সমাজে মুসলিম ও প্রবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের নতুন অধ্যায়। এখন দেখার পালা, এই তরুণ মেয়র তাঁর আদর্শকে বাস্তবে কতদূর রূপ দিতে পারেন।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন