ভেনেজুয়েলাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও কারাকাসের সম্পর্ক যে চরম উত্তেজনায় উপনীত হয়েছে, তা নতুন নয়।
তবে মার্কিন গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে যে পরিস্থিতির চিত্র ফুটে উঠছে, তাতে ইঙ্গিত মিলছে ওয়াশিংটন অভ্যন্তরীণভাবে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রায় সব প্রস্তুতি শেষ করে ফেলেছে।
এনপিআরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মহড়া, বাহিনী মোতায়েন ও কৌশলগত অবস্থান সব মিলিয়ে সম্ভাব্য আক্রমণের ‘প্রাক-প্রস্তুতি’ সম্পন্ন হওয়ার দিকে।
যুক্তরাষ্ট্র পেন্টাগন জানিয়েছে, ক্যারিবীয় অঞ্চলে মাদকবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে তারা পাঁচ দিনব্যাপী নৌ মহড়া চালাবে ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর উপকূলে। তবে ওয়াশিংটনের ঘোষণাই যে মূল উদ্দেশ্য নয়, তা আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা জোর দিয়ে বলছেন।
মহড়ায় অংশ নেবে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড, ১৫ হাজার মার্কিন সেনা, ২ হাজার মেরিন বাহিনী।
স্থানীয় সময় রোববার জাহাজটি উত্তর ক্যারিবীয় সাগরে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ভেনেজুয়েলা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি অন্তর্দৃষ্টিগতভাবে একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু কী সিদ্ধান্ত সেটি স্পষ্ট করেননি তিনি।
এই মন্তব্যের পরই সামরিক প্রস্তুতি দ্রুত এগোচ্ছে বলে ধারণা করছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, ত্রিনিদাদ–টোবাগো উপকূলে মার্কিন মহড়ার লক্ষ্য আসলে যুদ্ধ প্রস্তুতি।
পেতারে এক জনসভায় তিনি বলেন, ক্যারিবীয় অঞ্চলে সামরিক শক্তি প্রদর্শন করে ওয়াশিংটন ওই রাষ্ট্রগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে। দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোই ঠিক করবে তাদের ভূমি–সাগর মার্কিন যুদ্ধনীতির জন্য উন্মুক্ত থাকবে কি না।
মাদুরোর ভাষণে স্পষ্ট ছিল ক্ষোভ, পাশাপাশি ছিল সমর্থকদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা— আগামী সপ্তাহগুলো অত্যন্ত কঠিন হতে চলেছে।
পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, মহড়ার উদ্দেশ্য মূলত ক্যারিবীয় সাগরজুড়ে মাদক চোরাচালান প্রতিরোধ। তবে একই সঙ্গে তারা এও ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, পরিস্থিতির অবনতির প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলা ভূখণ্ডে স্থল অভিযানের অপশন প্রশাসনের টেবিলে রয়েছে।
ওয়াশিংটনের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার বর্তমান শাসনব্যবস্থা বদলাতে চাইছে এটা এখন আর গোপন নয়।
সিএনএনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভেনেজুয়েলায় বড় ধরনের সামরিক আক্রমণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সামরিক সক্ষমতা এখনো ক্যারিবীয় অঞ্চলে মোতায়েন হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলার ভূগোল দুর্গম, সেনাবাহিনী আকারে বড়, এবং রাজনৈতিকভাবে মাদুরো এখনো অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছেন।
সিএনএনের বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, সরাসরি স্থল আক্রমণ করলে মার্কিন সেনারা দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারেন
মাদুরো অপসারিত হলেও ক্ষমতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিরোধীদের হাতে যাবে এমন নিশ্চয়তা নেই।
লাতিন আমেরিকার রাজনীতি বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তবে তা হবে অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি একটি অভিযানের শুরু মাত্র। মাদুরো সরকার পতনের পর দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্রকে ৫ থেকে ১০ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামতে হতে পারে।
এক বিশ্লেষক মন্তব্য করেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় নেওয়া মানেই সমাধান নয়। ভেনেজুয়েলা আজ গভীর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটে। সামরিক হস্তক্ষেপ শুধু সাময়িক সমাধান দিতে পারে স্থায়ী নয়।
সব মিলিয়ে, ভেনেজুয়েলাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা, বিমানবাহী জাহাজের মোতায়েন এবং মহড়ার ঘোষণা সবই ইঙ্গিত দিচ্ছে আঞ্চলিক উত্তেজনার নতুন অধ্যায়ের।
ওয়াশিংটন এখনো সরাসরি হামলা ঘোষণা করেনি, কিন্তু প্রস্তুতি, অবস্থান ও রাজনৈতিক বার্তা সকল দিক থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন