মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী

মোদির একটি ফোন কল না করাতেই ভেস্তে গেল ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: জানুয়ারি ৯, ২০২৬, ০৬:৪৪ পিএম
মোদির একটি ফোন কল না করাতেই ভেস্তে গেল ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে হতেও শেষ পর্যন্ত তা থমকে গেছে। দুই দেশ যখন একটি ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তির দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ছিল, ঠিক তখনই নাটকীয়ভাবে সবকিছু ওলটপালট হয়ে যায়। 

মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকের দাবি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ফোন না করায় ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আগ্রহের অভাব ঘটে এবং চূড়ান্ত আলোচনার টেবিল থেকে ওয়াশিংটন সরে আসে।

পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে লুটনিক জানান, তিনি ব্যক্তিগতভাবে চুক্তির প্রতিটি খুঁটিনাটি চূড়ান্ত করেছিলেন। ভারতের আলোচকদের সঙ্গে দীর্ঘ দরকষাকষির পর একটি লাভজনক চুক্তির খসড়া প্রস্তুত ছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যবসায়িক ধাঁচের কূটনীতিতে শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা ছিল অপরিহার্য। 

লুটনিক বলেন, আমি সব গুছিয়ে রেখেছিলাম। চুক্তির সব শর্ত তৈরি ছিল। কিন্তু এটা ট্রাম্পের চুক্তি। আমি ভারতকে বলেছিলাম, মোদি যেন প্রেসিডেন্টকে একটা ফোন করেন। কিন্তু তারা সম্ভবত এতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেনি এবং মোদিও ফোন করেননি। 

তিনি আরও যোগ করেন যে, ভারতকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তিন সপ্তাহের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। ভারত যখন সেই সময় পার করে পুরোনো শর্তে চুক্তি করতে ফিরে আসে, ততক্ষণে ওয়াশিংটন তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে ফেলেছে। লুটনিকের ভাষায়, সেই সময় আর নেই। ট্রেন অনেক আগেই স্টেশন ছেড়ে চলে গেছে।

হাওয়ার্ড লুটনিক ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যিক কৌশলকে একটি সিঁড়ির সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার মতে, যেসব দেশ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে চুক্তিতে আসবে, তারা সবচেয়ে উঁচুতে বা সেরা অবস্থানে থাকবে। যুক্তরাজ্য দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তারা সেরা সুবিধা পেয়েছে। এরপর ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে সুবিধা আদায় করে নিয়েছে। ভারতের এই বিলম্বকে মার্কিন প্রশাসন একটি বড় কৌশলগত ভুল হিসেবে দেখছে। যখন ভারত পুনরায় আলোচনার টেবিলে ফিরেছে, তখন শর্তগুলো আরও কঠিন করে দেয় ওয়াশিংটন।

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের এই বাণিজ্যিক দূরত্বের প্রভাব ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম সম্প্রতি জানিয়েছেন যে, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত একটি বিলে ট্রাম্প সম্মতি দিয়েছেন। 

এই বিলটি কার্যকর হলে রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি তেল কেনা দেশগুলোর ওপর অবিশ্বাস্য ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করার ক্ষমতা পাবেন প্রেসিডেন্ট। বর্তমানে ভারত যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা কিছু পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক দিচ্ছে। এর বড় একটি অংশ মূলত রাশিয়ার তেল কেনার কারণে শাস্তি হিসেবে আরোপিত। যদি ৫০০ শতাংশ শুল্কের বিষয়টি কার্যকর হয়, তবে ভারতের বিনিয়োগ ও রপ্তানি খাত এক ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়বে।

নয়াদিল্লি কেন মোদির ফোন করার প্রস্তাবটি এড়িয়ে গেছে, তা নিয়ে নানা বিশ্লেষণ চলছে। অনেকে মনে করছেন, ভারতের পররাষ্ট্রনীতির যে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন রয়েছে, তাকে সমুন্নত রাখতেই হয়তো মোদি সরাসরি ফোন করে চুক্তির অনুরোধ জানাতে রাজি হননি। তবে এই ইগোর লড়াই বা কূটনৈতিক আড়ষ্টতা ভারতের অর্থনীতির জন্য চড়া মূল্য নিয়ে আসছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় পণ্যের চাহিদা থাকলেও উচ্চ শুল্কের কারণে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। 

অন্যদিকে, ভারতের প্রতিবেশী ও প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো দ্রুত আমেরিকার সঙ্গে সমঝোতা করে বাজার দখল করে নিচ্ছে। হাওয়ার্ড লুটনিকের এই সাক্ষাৎকার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এখন কেবল তথ্য বা উপাত্তই শেষ কথা নয়, বরং রাষ্ট্রপ্রধানদের ব্যক্তিগত রসায়ন ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভারত যখন তার বিশাল বাজার ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিল, তখন ট্রাম্প প্রশাসন আগে আসলে আগে পাবেন ভিত্তিতে বিশ্বের বাণিজ্যিক মানচিত্র নতুন করে সাজাতে ব্যস্ত। মোদির একটি ফোন কল না করা কি ভারতের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য এক বড় ভুল হিসেবে চিহ্নিত হবে? সময় এবং আসন্ন ৫০০ শতাংশ শুল্কের খড়্গই তা বলে দেবে।

জেএইচআর