আগ্নেয়গিরির মুখে ইরান: ট্রাম্পের হামলার হুমকির মুখে খামেনির ঐক্যের ডাক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: জানুয়ারি ১০, ২০২৬, ০৯:২৯ এএম
আগ্নেয়গিরির মুখে ইরান: ট্রাম্পের হামলার হুমকির মুখে খামেনির ঐক্যের ডাক
ছবি: সংগৃহীত

ইরানের রাজপথ এখন বারুদের স্তূপ। অর্থনৈতিক সংকটের চাপে পিষ্ট সাধারণ মানুষ গত ২৮ ডিসেম্বর যে বিক্ষোভের সূচনা করেছিল, তা এখন ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির অস্তিত্বের মূলে আঘাত হানছে। ব্যবসায়ীদের হাত ধরে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে এখন যোগ দিয়েছেন ছাত্র, যুবক ও অগণিত নারী। বিক্ষোভকারীরা কেবল অর্থনৈতিক সংস্কার নয়, বরং ১৯৭৯ সালের বিপ্লব পরবর্তী বর্তমান শাসনব্যবস্থার অবসান চাইছেন।

মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে শহরগুলো

নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’ (আইএইচআর) জানিয়েছে, গত ১৩ দিনের বিক্ষোভে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মারমুখী অবস্থানে এখন পর্যন্ত ৪৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতের তালিকায় অন্তত আটটি শিশু রয়েছে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল গত বুধবার, যেদিন একদিনেই প্রাণ হারান ১৩ জন বিক্ষোভকারী। এছাড়া দেশজুড়ে ধরপাকড় অভিযানে এখন পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার ২৭০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ ও শাহ-পন্থী স্লোগান

বিক্ষোভের তীব্রতা এতোটাই বেশি যে, আন্দোলনকারীরা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ভবন (আইআরআইবি), মেট্রো স্টেশন এবং বিভিন্ন ব্যাংকে অগ্নিসংযোগ করেছেন। ইসফাহান, বাবল এবং তেহরানের রাজপথে বিক্ষোভকারীদের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে নজিরবিহীন স্লোগান। কোথাও শোনা যাচ্ছে ‘স্বৈরশাসক নিপাত যাক’, আবার কোথাও নির্বাসিত সাবেক রাজপুত্র রেজা পাহলভির সমর্থনে স্লোগান উঠছে— ‘শাহ দীর্ঘজীবী হোক’। অনেক জায়গায় ইরানের জাতীয় পতাকায় আগুন দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

ট্রাম্পের উসকানি ও ‘হামলার হুমকি’

ইরানের এই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিক্ষোভের শুরু থেকেই তিনি আন্দোলনকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছেন। তবে গত ২ জানুয়ারি তিনি সরাসরি দেশটিতে সামরিক হামলার ইঙ্গিত দেন। গতকাল এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প আবারও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি ইরান সরকার নিজ দেশের মানুষকে হত্যা করা বন্ধ না করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত কঠোরভাবে আঘাত হানবে।

এর আগে গত সপ্তাহে ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার ঘটনার পর ট্রাম্পের এই হুমকিকে তেহরান অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে। তবে ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি এখনই নির্বাসিত নেতা রেজা পাহলভির সাথে কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসছেন না।

খামেনির পাল্টা অভিযোগ ও দেশবাসীর প্রতি আহ্বান

মার্কিন হুমকির মুখে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি চলমান এই সহিংসতাকে ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। খামেনি বলেন, ট্রাম্পের হাত ইরানিদের রক্তে রঞ্জিত। বিক্ষোভকারীরা বিদেশি ভাড়াটে যোদ্ধাদের মতো আচরণ করছে এবং ট্রাম্পের ইশারায় সরকারি সম্পত্তিতে আগুন দিচ্ছে। তিনি দেশবাসীকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের’ বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান এবং হুঁশিয়ারি দেন যে, কোনো ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপ সহ্য করা হবে না।

কেন এই ক্ষোভ?

দীর্ঘদিনের পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। বর্তমানে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ৪০ শতাংশ ছাড়িয়েছে এবং মুদ্রার মানে রেকর্ড পতন ঘটেছে। এর ওপর গত বছরের জুনে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ১২ দিনের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধে ইরানের পরমাণু স্থাপনা ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, সরকারি দুর্নীতি এবং ভুল পররাষ্ট্রনীতির কারণে তারা আজ দরিদ্র ও একঘরে হয়ে পড়েছেন।

বিচ্ছিন্ন ইরান: ইন্টারনেট ও আকাশপথ স্থবির

বৃহস্পতিবার রাত থেকে ইরানে ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ২০ বছরে ইরানের ইতিহাসে এমন ব্ল্যাকআউট কখনো দেখা যায়নি। ইন্টারনেট না থাকায় বিশ্ববাসী তেহরান বা ইসফাহানের প্রকৃত চিত্র দেখতে পাচ্ছে না। এছাড়া নিরাপত্তার অভাবে টার্কিশ এয়ারলাইনস ও কাতার এয়ারওয়েজসহ আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো ইরানে তাদের ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করেছে।

পাহলভির ডাক ও আগামীর শঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত রেজা পাহলভি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনকারীদের রাত-দিন রাজপথে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এই বিক্ষোভের জন্য ‘পিপলস মুজাহিদিন অর্গানাইজেশন’ (এমকেও) নামক নিষিদ্ধ সংগঠনকে দায়ী করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই বিক্ষোভ ২০০৯ বা ২০২২ সালের আন্দোলনের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। যদি দমন-পীড়ন আরও বাড়ে এবং ট্রাম্পের হুমকি বাস্তব রূপ নেয়, তবে মধ্যপ্রাচ্য এক ভয়াবহ যুদ্ধের কবলে পড়তে পারে।

এএন