তেহরানে অস্থিরতা ও ওয়াশিংটনের হুমকি, সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কায় ইসরায়েলে সর্বোচ্চ সতর্কতা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: জানুয়ারি ১১, ২০২৬, ০৪:২৩ পিএম
তেহরানে অস্থিরতা ও ওয়াশিংটনের হুমকি, সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কায় ইসরায়েলে সর্বোচ্চ সতর্কতা

ইরানে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলমান। রাজধানী তেহরানসহ দেশটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে ছড়িয়ে পড়া এই গণজাগরণ কেবল ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকট হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবেশী দেশ এবং পশ্চিমা শক্তিগুলোর মধ্যে। 

এই টালমাটাল পরিস্থিতির সুযোগে বা বিক্ষোভকারীদের রক্ষায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে কোনো ধরণের হস্তক্ষেপ করতে পারে, এমন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিজেদের সামরিক ও গোয়েন্দা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রেখেছে ইসরায়েল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত কয়েক দিন ধরে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর ওপর চাপ বাড়িয়ে চলেছেন। রাজপথে নেমে আসা বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর বলপ্রয়োগের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে ট্রাম্প ইরানকে বারবার সতর্ক করেছেন। 

শনিবার এক ভাষণে তিনি সরাসরি উল্লেখ করেন যে, ইরান যদি পরিস্থিতি সামলাতে ব্যর্থ হয় বা মানবাধিকার লঙ্ঘন অব্যাহত রাখে, তবে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে। ট্রাম্পের এই সহায়তা শব্দটিকে কূটনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকরা সম্ভাব্য সরাসরি হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।

রোববার ১১ জানুয়ারি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনটি ইসরায়েলি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সপ্তাহান্তে ইসরায়েলের শীর্ষ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি জরুরি নিরাপত্তা পরামর্শ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই বৈঠকেই দেশটিকে উচ্চ সতর্কতায় রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। 

যদিও সর্বোচ্চ সতর্কতার অধীনে কী ধরণের রণকৌশল বা সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা গোপনীয়তার স্বার্থে প্রকাশ করা হয়নি, তবে ধারণা করা হচ্ছে, ইরান যদি দেশের ভেতরের বিক্ষোভ থেকে দৃষ্টি সরাতে ইসরায়েলে কোনো প্রক্সি হামলা চালায়, তবে তার দাঁতভাঙা জবাব দিতে তেল আবিব প্রস্তুত। কূটনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে শনিবারের এক উচ্চপর্যায়ের ফোনালাপ নিয়ে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দীর্ঘ সময় ধরে টেলিফোনে কথা বলেছেন। 

ফোনালাপের বিষয়ে অবগত এক ইসরায়েলি সূত্র জানিয়েছে, দুই নেতার আলোচনার মূল বিষয়বস্তু ছিল ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের রূপরেখা এবং পরবর্তী আঞ্চলিক প্রভাব। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ফোনালাপের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও আলোচনার স্পর্শকাতর তথ্য প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে এটি স্পষ্ট যে, ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।

এদিকে ইরানের ভেতরে বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে দেশটির রেভল্যুশনারি গার্ড। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৬২ জনে দাঁড়িয়েছে। ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে দেওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্লক করার মাধ্যমে তথ্য আড়াল করার চেষ্টা করলেও তেহরানের রাজপথ এখন স্লোগান আর ক্ষোভে উত্তাল। ইসরায়েলের জন্য ইরান সবসময়ই এক নম্বর অস্তিত্বের সংকট। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং সিরিয়া লেবাননে তাদের প্রভাব নিয়ে ইসরায়েল দীর্ঘকাল ধরেই উদ্বিগ্ন। 

এখন ইরানের ভেতরে এই ধরণের অস্থিরতা এবং তাতে মার্কিনদের জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা ইসরায়েলকে যেমন আশান্বিত করছে, তেমনি সংঘাতের আশঙ্কায় সতর্কও করছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে কোনো ধরণের ড্রোন হামলা বা সাইবার আক্রমণ চালায়, তবে তার পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরান ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র তাক করতে পারে। 

মূলত এই পাল্টা আঘাতের ঝুঁকি কমাতেই ইসরায়েলের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আয়রন ডোম এবং অ্যারো সিস্টেমকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এবং তাতে মার্কিন হস্তক্ষেপের সম্ভাবনার জেরে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে এক অস্থির এবং অনিশ্চিত সমর পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

জেএইচআর