ট্রাম্পের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা

বৈশ্বিক দক্ষিণের ভবিষ্যৎ ও বাংলাদেশের কৌশলগত চ্যালেঞ্জ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৫, ২০২৬, ০৩:৫৪ পিএম
বৈশ্বিক দক্ষিণের ভবিষ্যৎ ও বাংলাদেশের কৌশলগত চ্যালেঞ্জ

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ভাবনায় এক মৌলিক এবং নাটকীয় পরিবর্তন এনেছে। ২০২৫ সালের নবপ্রণীত ‘জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল’ নথিতে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এখন আর বিশ্বের অভিভাবক বা গণতন্ত্রের প্রচারক হিসেবে নিজেকে দেখতে আগ্রহী নয়। বরং দেশটি এখন অনেক বেশি অন্তর্মুখী, স্বার্থকেন্দ্রিক এবং অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। এই নীতির প্রভাব শুধু ওয়াশিংটনের করিডোরে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর ঢেউ আছড়ে পড়ছে দক্ষিণ এশিয়া তথা বাংলাদেশের ওপর।

মনরো ডকট্রিনের পুনরুজ্জীবন ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন কৌশলে যুক্তরাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্ব এবং পশ্চিম গোলার্ধে প্রভাব বজায় রাখাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। ১৯ শতকের বিখ্যাত মনরো ডকট্রিনের আদলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও তার নিজের অঞ্চলকে বাইরের শক্তির প্রভাবমুক্ত রাখার ঘোষণা দিয়েছে।

 

এর অর্থ হলো, আমেরিকা এখন নিজের সীমানা রক্ষা এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণকে জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখছে।

অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ ও শুল্ক যুদ্ধ ট্রাম্পের নতুন নীতিতে সামরিক শক্তির চেয়েও অর্থনৈতিক শক্তিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্য এখন আর কেবল পণ্য আদান-প্রদান নয়, এটি এখন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার একটি প্রধান হাতিয়ার। যুক্তরাষ্ট্র তার বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে কঠোর শুল্ক আরোপের পথে হাঁটছে।

বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এটি বড় উদ্বেগের কারণ, কারণ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় গন্তব্য হলো যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন এখন লেনদেনভিত্তিক বা আদান-প্রদানমূলক সম্পর্কে বিশ্বাসী। বাংলাদেশ যদি মার্কিন বাজারে রপ্তানি সুবিধা বজায় রাখতে চায়, তবে প্রতিদান হিসেবে তাকেও মার্কিন পণ্য আমদানিতে বিশেষ ছাড় দিতে হতে পারে।

জ্বালানি আধিপত্য ও জলবায়ু ঝুঁকি নতুন মার্কিন কৌশলে জীবাশ্ম জ্বালানি, বিশেষ করে তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন সম্প্রসারণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুকে গৌণ করে জ্বালানি রপ্তানিকে ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে।

জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য এটি একটি নেতিবাচক দিক হতে পারে, কারণ বিশ্বজুড়ে জলবায়ু অর্থায়ন এবং অভিযোজন সহায়তা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস আমদানির মাধ্যমে ঢাকা ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে পারে। তবে এক্ষেত্রে একক উৎসের ওপর নির্ভরতা এবং উচ্চ পরিবহন ব্যয়ের ঝুঁকিও রয়েছে।

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বহুকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্য থেকে মনোযোগ সরিয়ে পূর্ণশক্তি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিয়োগ করছে। তবে তারা আর নিজেরা সরাসরি সব দায়িত্ব নিতে চায় না। বরং ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর দায়ভার চাপিয়ে দিতে আগ্রহী। চীনকে এখন আর আদর্শগত শত্রু নয়, বরং একটি কৌশলগত প্রতিযোগী হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বাংলাদেশের জন্য এক ধরনের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন তৈরি করছে। ঢাকা যেমন চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে অংশ নিতে পারছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও নিরাপত্তা সহযোগিতা চালিয়ে যেতে পারছে।

সম্পৃক্ত ও সম্প্রসারণ নীতি ও ইউএসএআইডির বিলুপ্তি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে একটি বিশাল পরিবর্তন হলো ইউএসএআইডির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্র এখন আর সাহায্য বা উন্নয়ন সহায়তা দিয়ে সম্পর্ক গড়তে চায় না। তাদের নতুন নীতি হলো সম্পৃক্ত ও সম্প্রসারণ, যার অর্থ হলো যেখানে মার্কিন জাতীয় স্বার্থ ও বিনিয়োগ সুরক্ষিত থাকবে, সেখানেই কেবল তারা সম্পৃক্ত হবে।

বাংলাদেশের খনিজ সম্পদ না থাকলেও আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবাদের পুনরুত্থান রোধে ঢাকার কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় উগ্রপন্থা ও মানব পাচার রোধে মার্কিন প্রযুক্তির সহায়তা এবং যৌথ প্রশিক্ষণ নতুন মার্কিন অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।

মূল্যবোধের চেয়ে স্বার্থ বড় এতদিন যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং বাকস্বাধীনতার শর্ত দিয়ে বিভিন্ন দেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করত। কিন্তু ট্রাম্পের নতুন নীতিতে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার প্রবণতা অনেক কমে আসবে, যদি না তা সরাসরি মার্কিন স্বার্থকে আঘাত করে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি রাজনৈতিকভাবে কিছুটা স্বস্তিদায়ক হলেও, দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নড়বড়ে হওয়ার এবং কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করে।

একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল পরিবর্তিত এই বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের জন্য টিকে থাকা এবং লাভবান হওয়া নির্ভর করবে তার কূটনৈতিক দক্ষতার ওপর।

বাংলাদেশের জন্য বাণিজ্য বহুমুখীকরণ, অর্থাৎ শুধু মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভর না করে নতুন নতুন বাজার অনুসন্ধান করা জরুরি। সেই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জ্বালানি ব্যবসা বাড়ানো, তবে তা যেন আর্থিক ঝুঁকির কারণ না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা। এ ছাড়া সন্ত্রাসবাদ দমনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও কারিগরি সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতার মধ্যে কোনো এক পক্ষে যোগ না দিয়ে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখা প্রয়োজন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০২৫ সালের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল বিশ্বকে এক অনিশ্চিত কিন্তু স্বার্থনির্ভর বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এটি যেমন একদিকে রপ্তানি ও জলবায়ু সহায়তার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, অন্যদিকে নিরাপত্তা সহযোগিতা ও জ্বালানি কূটনীতির নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। এই পরিবর্তনশীল মার্কিন কৌশলকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণই হবে বাংলাদেশের আগামী দিনের পররাষ্ট্রনীতির মূল পরীক্ষা।

জেএইচআর